1. muktokotha@gmail.com : Harunur Rashid : Harunur Rashid
  2. isaque@hotmail.co.uk : Harun :
  3. harunurrashid@hotmail.com : Muktokotha :
আমাদের চে গুয়েভারা মুক্তাদির - মুক্তকথা
শনিবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৯:২১ পূর্বাহ্ন

আমাদের চে গুয়েভারা মুক্তাদির

সংবাদদাতা
  • প্রকাশকাল : বুধবার, ২ নভেম্বর, ২০১৬
  • ৮৫১ পড়া হয়েছে
মুক্তাদির

প্রয়াত মা. আ. মুক্তাদির

ইব্রাহীম চৌধুরী
১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬

তুমি আমাদের প্রথম যৌবনের চে গুয়েভারা ছিলে।
মরে গিয়ে তুমি নিঃশেষ হয়ে যাওনি।
মুক্তির প্রতিটি মিছিলে তুমি আছ, যেমন করে ছিলে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।

দেশ-মাতৃকার জন্য তরুণ বয়সে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন। একাত্তরে ছিলেন ছাত্র। বাংলার মুক্তিযুদ্ধের ডাক এলে বাবা-মায়ের কনিষ্ঠ সন্তান বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন। যুদ্ধ তার কৈশোর কেড়ে নিয়েছিল। মুক্তি আর শৃঙ্খল ভাঙার আহ্বানে মায়ের আঁচল ছেড়েছিলেন। সেই ম আ মুক্তাদির আর ঘরে ফেরেনি।

সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশে বঞ্চিত মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে শামিল হয়ে গেলেন মুক্তাদির। সারা বিশ্বে তখন সমাজ পরিবর্তনের আহ্বান। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে নিকট ভারতের নকশালবাড়ী আন্দোলন। শোষণ নিপীড়নের জন্য দায়ী পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের আহ্বান। এই আহ্বানে যোগ দেন আমাদের বিপ্লবী অগ্রজ মুক্তাদির।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যখন নানা বিভ্রান্তি, চড়াই-উতরাই, আমাদের তখন দ্রোহকাল। রাজপথেই পরিচয় অগ্রজ এই লড়াকুর সঙ্গে। ব্যক্তিত্ব ও প্রজ্ঞায় যিনি সহজেই আমার মতো অনেককে আকৃষ্ট করতে পেরেছিলেন।

সিলেটের সুরমা নদীর তীরে বাড়িতে মুক্তাদিরের অসুস্থ বাবা-মা ছিলেন। তাঁদের তিনি দেখতে যেতেন কদাচিৎ। বছরের পর বছর দেখেছি তাঁর কোনো স্থায়ী আবাস ছিল না। কখনো কমরেডদের সঙ্গে, কখনো শুভানুধ্যায়ীদের বাড়িতে ছিল তাঁর ঠিকানা। খেয়ে, না খেয়ে কেটেছে দিনের পর দিন। কপর্দকহীন মুক্তাদির ছিলেন নির্বিকার।

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মুক্তাদির ছিলেন দালাল-রাজাকারদের ত্রাস। রাজনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করেননি কখনো। সত্তর ও আশির দশকে সিলেট অঞ্চলে এক সম্ভাবনাময় সংগঠক হয়ে উঠেছিলেন তিনি। পরে ছাত্র-যুব সমাজের দ্রোহের মিছিলে যোগ দেন। ৭২ সাল থেকেই তৎকালীন জাসদ ছাত্রলীগের নানা পর্যায়ে নেতৃত্বে ছিলেন। ১৯৮০ সালে আদর্শিক বিতর্কে জাসদ বিভক্ত হলে বাসদ গঠনে সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। ছাত্র-যুবক থেকে কৃষক শ্রমিক পর্যন্ত সাংগঠনিক কাজে দিন-রাত ব্যস্ত থাকতেন।

দেশে সামরিক শাসন শুরু হলে মুক্তাদিরকে দীর্ঘ কারাবাসে থাকতে হয়। বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তন ঘটে। সমাজতান্ত্রিক শিবিরগুলোতে শুরু হয় নানা বিতর্ক ও সংশয়। বোহিমিয়ান মুক্তাদিরকে তখন সিলেটের রাজনৈতিক পরিবার থেকেই সংসারী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক ব্রিটিশ তরুণীর সঙ্গে তাঁকে বিয়ে দেওয়া হয় অনেকটা আয়োজন করেই। মুক্তাদিরকে গ্রেপ্তার বরণ করতে হয় নববিবাহিতা স্ত্রীর পাশ থেকেই। এক মামলায় জামিনে আসেন, আবার অন্য মামলায় জড়ানো হয়। এর মধ্যে নববধূ লন্ডনে চলে যান। সংসার রক্ষার জন্য এবং কিছুদিন সরে থাকার জন্য লন্ডন চলে যাওয়ার পরামর্শ প্রদান করেন রাজনৈতিক অভিভাবকেরা।

১৯৮৫ সালের এক মধ্য দুপুরে মুক্তাদির হুলিয়া মাথায় নিয়ে লন্ডনের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রিয় শহর ছাড়ার সময়টিতেও ছাত্র সংঘর্ষ চলছিল। দলের নেতা-কর্মীরা হামলায় আহত হয়ে হাসপাতালে। পুলিশের তল্লাশি চলছে। সিলেট রেলস্টেশনের আউটার সিগনালে দাঁড়িয়ে হাতটা চেপে ধরে বলেছিলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই চলে আসব। ফিরে আসা হয়নি তাঁর। ১৯৯৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর মাত্র ৪৪ বছর বয়সে জীবনের সব সংগ্রামের ইতি টানেন মুক্তাদির।

মাতৃভূমি ছেড়ে লন্ডনে গিয়ে বিপাকেই পড়তে হয় মুক্তাদিরকে। চিন্তা ও সংস্কৃতিতে বিস্তর ফারাক স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি ঘটে। মুক্তিযোদ্ধা, লড়াকু মুক্তাদির সংসার যুদ্ধে সহজেই হেরে গেলেন। লন্ডনে যাওয়ার পর ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। শিশু সন্তানকে রেখেই স্ত্রী তাঁকে ত্যাগ করে চলে যান। চরম বেকায়দায় পড়েন মুক্তাদির। একদিকে স্বজনহীন পরিবেশে শিশু সন্তানকে মা ছাড়া লালন পালন করা। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে বসবাসের বৈধতাও ছিল না তাঁর। কাজ-কর্মহীন মুক্তাদিরের লন্ডন অধ্যায় ছিল আরও সংগ্রামের। শিশু সন্তানকে আগলে রেখে একসময় অবলীলায় সক্রিয় হয়ে ওঠেন লন্ডনে বাংলাদেশি কমিউনিটির নানা সব কর্মযজ্ঞে। দেশের বাড়িতে অসুস্থ বাবা-মা, ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়া রাজনীতির সহযোদ্ধাদের নিয়ে মানসিক পীড়নে পড়েন মুক্তাদির। এর মধ্যে বাবা মারা যান।

বিয়ে বিচ্ছেদ পরবর্তী সামাজিক ও আইনি জটিলতায় ব্যক্তিগত জীবনে বেশ সমস্যায় পড়তে হয় তাঁকে। তবে সক্রিয় থাকেন লন্ডনে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে। যুক্তরাজ্যে বাম রাজনীতিতে আবার ঝাঁপিয়ে পড়েন অবলীলায়। বাংলাদেশিদের নিত্যদিনের সাংগঠনিক কাজকর্মের অবধারিত সংগঠকে পরিণত হন। যুক্তরাজ্যের নাগরিক অধিকার আন্দোলনে প্রগতিশীল ধারার সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান। মৃত্যুর কিছুদিন আগে মুক্তাদির চিন্তায় ও মননে কাছাকাছি আসেন অন্য এক নারীর। বেশ ঘটা করে দ্বিতীয়বারের মতো সংসারী হওয়ার উদ্যোগ নেন। টেমস নদীতে জাহাজ ভাসিয়ে দ্বিতীয় বিয়ের উৎসব করেন লন্ডনে তাঁর অনুরাগীরা। সেই স্ত্রীর ঘরে আরেক সন্তানের জন্মের দুই সপ্তাহ পরই মারা যান মুক্তাদির। নানা অপ্রাপ্তির তীব্র বেদনা নিয়ে সমাজ বদলের এক মাঠ সংগঠক হয়তো ব্রতী হয়েছিলেন নিজের জীবনটাকে একটুখানি বদলাতে। তা আর হয়ে ওঠেনি।

১৯৯৫ সালে দেশ ছেড়ে পশ্চিমমুখী হওয়ার যাত্রাপথে আমি লন্ডনে থেমেছিলাম। উষ্ণ আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরেছিলেন। যার সান্নিধ্যে যৌবনের দ্রোহকালের দীক্ষা হয়েছিল, সেই অগ্রজ কমরেডকে পেয়েছিলাম আবারও দিন কয়েকের জন্য একান্ত সান্নিধ্যে। ছিন্ন ভিন্ন হওয়া সহযোদ্ধাদের কথা, রাজনীতির নানা ভুল আর ভ্রান্তি নিয়ে অনুতাপের কথা বলেছিলেন। ঘাতক দালাল আর রক্ষণশীলদের উত্থানে উৎকণ্ঠা আর উদ্বেগ ছিল তাঁর মধ্যে।

যাবেন না দেশে? এমন প্রশ্নের উত্তরে চোখের কোণে ঝিলিক দেখেছিলাম। একজন সত্যিকারের বিপ্লবী তাঁর ভেঙে পড়া আবেগ প্রকাশ করতে পারেন না। অনেকক্ষণ নীরব থেকে বলেছিলেন, ‘তোমরাও তো দেশটা ছেড়ে দিলে!’ বুকে হাহাকার উঠেছিল। বলেছিলাম, ‘আমরা আবার ফিরব।’ না, ফেরা আর হয়নি আমার এবং আমার মতো অনেকের।

মুক্তাদির ফিরেছিলেন। কফিনে করে। সিলেটের মানুষ স্মরণকালের অন্তিম অভিবাদন জানিয়েছিল শান্ত শহরের এক অশান্ত বিপ্লবীর অকাল মৃত্যুর পর। সুরমা পারে নিজের বাড়িসংলগ্ন কবরে তাঁকে সমাহিত করা হয়। কবরের দিকে চেয়ে চেয়ে মা-ও মারা গেলেন একদিন। যে সড়ক পথ দিয়ে দেশ স্বাধীন করতে কিশোর মুক্তাদির ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন, সড়কটির পাশেই তাঁর কবর। যে সুরমা নদী পেরিয়ে সমাজ বদলের স্বপ্নে মুক্তাদির বেরিয়েছিলেন, সেই নদী আজও বহমান। কবর দেশে থাকা স্বপ্নচারী মানুষটির অনেক অকথিত উচ্ছ্বাস আর বেদনার সাক্ষী হয়ে সুরমায় আজও জোয়ার-ভাটা আসে। মানুষের নিত্যদিনের সংগ্রামের আকুতি আজও ধারণ করে উর্বর পলিমাটি।

মৃত্যুর বাস্তবতা বড় নিষ্ঠুর। বড় বেদনার। মানুষটি তাঁর কৈশোর থেকে জীবনের শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত দিয়েছিলেন জনগণের জন্য। লন্ডনে বাংলাদেশিদের উত্থানের সময়ে বাংলা টাউন হিসেবে এলাকা চিহ্নিত করা হবে। কমিউনিটির মধ্যে উৎসব আনন্দ। এ নিয়ে চলছিল নানা দলাদলি ও কোন্দল। মুক্তাদির সবকিছু সামাল দিয়ে বাংলা টাউনের উদ্বোধনে রাখেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। অনুষ্ঠানেই তিনি জ্ঞান হারান। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরও রক্ষা করা যায়নি। দেশের মানুষের কর্মচাঞ্চল্যের মধ্যে থেকেই যেন চলে গেলেন অন্তিম অজানায়।

মুক্তাদিরের মৃত্যুর পর কিছুদিন ছিল অনুরাগী সতীর্থদের আক্ষেপ আর বেদনার নিশ্বাস। সময় বড় নিষ্ঠুর। আমরা আর কেউ খোঁজ রাখিনি। সবাই নিজের জীবনযুদ্ধের হিসাব মেলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। ছিন্ন ভিন্ন হয়ে পড়া জীবনারণ্যে আমরা যেন হারিয়ে যাই। ব্যক্তিজীবন, সমাজ জীবনের হিসাবটাও সময়ে পাল্টে যায়। যে দেশে, যে সমাজে এক স্বপ্ন বিলাসী মানুষ তাঁর জীবনের সর্বস্ব দিয়ে গেলেন, তাঁকে কেউ আর মনে করে না। মুক্তিযোদ্ধার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রও এগিয়ে আসেনি। বাড়ির পাশের সড়কটির নামকরণের দাবি উঠেছিল, তাও সফল হয়নি। মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে, তাদের কল্যাণ নিয়ে সদা তাঁকে ব্যস্ত থাকতে দেখেছি। মুক্তিযুদ্ধের সরকার ক্ষমতায় এসেছে। মুক্তিযোদ্ধারা সাংগঠনিক শক্তি অর্জন করেছেন। বেশ কয়েক বছর আগে দেশে গিয়ে পুরোনো কমরেডদের নিয়ে মুক্তাদিরের কবরের খোঁজে গিয়েছিলাম। সবুজে ঢাকা বাড়ির পাশে কবর খুঁজতে গিয়ে বিভ্রমে পড়ি। একটি নাম ফলকও জোটেনি রাষ্ট্র থেকে। কোনো প্রতিষ্ঠান, কোনো সহযোদ্ধা কেউ এগিয়ে আসেননি। যেন কার দায় পড়েছে এক হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন বিলাসীকে মনে রাখার!

স্ত্রী সন্তান রেখে দূর দেশের রাজপথেই ছিল মুক্তাদিরের শেষ দিন। যাদের কর্মচাঞ্চল্যে জীবনের অন্তিম সময়েও সক্রিয় ছিলেন, তারাও মনে রাখেননি। স্ত্রী সন্তানদের খবর পর্যন্ত আজ আর কেউ জানে না। সময়টা বড় নিষ্ঠুর। বাস্তবতা বড় নির্মম।

মুক্তাদিরের মৃত্যুর ১৯ বছর পর সহযোদ্ধা কমরেড শাহাব উদ্দিন উদ্যোগী হয়েছেন। দুই দশক পরে দেশে গিয়ে স্মৃতি সংসদ করা হয়েছে। কবরে নামফলক লাগানো হয়েছে। এখনো যারা সমাজ নিয়ে, মানবিকতা নিয়ে কাজ করেন-তাদের সম্পৃক্তি ঘটেছে স্মৃতি সংসদে। প্রায় হারিয়ে যাওয়া আমাদের স্বপ্ন বিলাসের সাথি মুক্তাদিরের প্রতি স্মৃতিময় শ্রদ্ধা। সিলেট থেকে নিউইয়র্ক ও লন্ডনে তাঁর স্মৃতি রক্ষার জন্য নতুন উদ্যোগ শুরু হয়েছে।

আমাদের চে গুয়েভারা মুক্তাদির প্রায়ই বলতেন, বিপ্লবীরা নিঃশেষ হয় না। পরিবর্তনের এ সময়ে আজকের অনেকের ধারণায় নেই সেই সময়টা কেমন ছিল? কতটা উত্তাপ ছিল মনের গহিনে। মুক্তাদির আমাদের কিউবা ও বলিভিয়ার সমাজ বদলের গল্প শোনাতেন। কাস্ত্রো আর চে গুয়েভারার আলাপে স্বপ্নের জাল বুনতেন।

দ্রোহকালের অগুনতি স্মৃতির ভিড়ে ব্যক্তিগত বেদনার উচ্চারণে আজ বলতে চাই,
তোমার স্মৃতি অমর হোক মুক্তাদির ভাই।

তুমি আমাদের প্রথম যৌবনের চে গুয়েভারা ছিলে। মরে গিয়ে তুমি নিঃশেষ হয়ে যাওনি। মুক্তির প্রতিটি মিছিলে তুমি আছ, যেমন করে ছিলে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।(প্রথম আলো থেকে)

এ জাতীয় সংবাদ

তারকা বিনোদন ২ গীতাঞ্জলী মিশ্র

বাংলা দেশের পাখী

বাংগালী জীবন ও মূল ধারার সংস্কৃতি

আসছে কিছু দেখতে থাকুন

© All rights reserved © 2021 muktokotha
Customized BY KINE IT