1. muktokotha@gmail.com : Harunur Rashid : Harunur Rashid
  2. isaque@hotmail.co.uk : Harun :
  3. harunurrashid@hotmail.com : Muktokotha :
ইতিহাস কথা কয়। নবাব সিরাজুদ্দৌলার পুত্র জীবন কাটান সিলেটে - মুক্তকথা
শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০২৪, ০৬:৩৮ পূর্বাহ্ন

ইতিহাস কথা কয়। নবাব সিরাজুদ্দৌলার পুত্র জীবন কাটান সিলেটে

সংবাদদাতা
  • প্রকাশকাল : শনিবার, ২৫ জুন, ২০১৬
  • ১৭১৪ পড়া হয়েছে

image_9747_1Son-of-Sirajuddoulaমুক্তকথা: ২৫শে জুন ২০১৬: রাত ৩.৪১::
জাগো সিলেট ডট কম এ মামুন পারভেজের সম্পাদনায় মজাদার একটি ঐতিহাসিক নিবন্ধ ছাপা হয়েছে দেখে পড়লেম। ইতিহাসের পড়ুয়াদের জন্য নিশ্চয়ই এই লিখাটি উপভোগ্য হবে মনে করেই পাঠকদের ইতিহাস রসসুধা ভোগের জন্য মুক্তকথায় পুনঃ পত্রস্ত করলাম।
-সম্পাদক

মামুন পারভেজ : কালের নির্মম পরিহাস। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ দৌলা। মিরজাফর ও তার দোসরদের বিশ্বাস ঘাতকতার ফলে ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৩শে জুন অস্তিমিত হয় বাংলা তথা ভারতবর্ষের স্বাধীনতার সূর্য। ভাগ্যের নির্মমতায় এই নবাব পরিবারের সন্তানদের যুগে যুগে লাঞ্চনা বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে। জীবনরক্ষার তাগিদে এদের হতে হযেছে ধর্মান্তরিত। গোপন রাখতে হয়েছে তাদের প্রকৃত বংশ পরিচয়। জীবন নাশের আশঙ্কা থাকার কারনে সিরাজের পুত্রের প্রকৃত পরিচয় গোপন রাখেন তাঁর মামা মোহনলাল। কালের খেয়ায় ভেসে ভেসে নবাব সিরাজ উদ দৌলা ও আলেয়ার একমাত্র পুত্র যুগল কিশোর রায় চৌধুরী সিলেটের কাজল শহর (বর্তমানে কাজল শাহ) জমিদারি ক্রয় করেন এবং জীবনের অন্তিম সময়টুকু এই সিলেট শহরেই কাটান। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক অমলেন্দু দে এ ব্যাপারে বিস্তর গবেষনা করে এ তথ্য গুলোর ব্যপারে নিশ্চিত হন।

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে মিরজাফর ও তাঁর সংগীদের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে নবাবের বিপর্যয়ের কাহিনী কারো অজানা নয়। ঠিক তেমনি বাংলার বীর সেনানী মীরমদন মোহনলালের বিশ্বস্ততার কথা সবার জানা। আমি মূল প্রসঙ্গে যাবার আগে অন্যান্য বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করতে চাই। তাতে মূল বিষয়টি সবার বোধগম্য হবে।

১৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে নবাব হবার পরই দৃঢ়তা প্রদর্শন করে সিরাজউদদৌলা যে দুজন দক্ষ অফিসারের ওপর আস্থা স্থাপন করেছিলেন তারা ছিলেন মিরমদন ও মোহনলাল। এক সময় স্বার্থপর বিশ্বাস ঘাতক মিরজাফরকে সেনাবাহিনীর প্রধান পদ থেকে সরিয়ে নবাব সে দায়িত্ব দেন মীরমদন কে তেমনি মোহন লাল কেও নবাবের দেওয়ান খানার পেসকার নিযুক্ত করে ‘মহারাজা’ পদবী দেন।

মোহন লালের বোন আলেয়ার সঙ্গে নবাবের প্রণয় তারপর মুসলিম রীতি অনুযায়ী বিবাহ হয়। আঠারো শতকে মোহনলাল কাশ্মীর থেকে মুর্শিদাবাদে আসেন। মোহলালের বোনের প্রকৃত নাম ছিল মাধবী। তাকে আদর করে হীরা ডাকা হতো। মোহনলালের সঙ্গে সিরাজের সখ্যতা ছিল। সেই সূত্রে হীরার সঙ্গে সিরাজের অন্তরঙ্গতা হয়। এর ফলে হীরার গর্ভে সিরাজের এক পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে। হীরার সঙ্গে সিরাজের অন্তরঙ্গতা ও সন্তানের খবর জানতে পেরে নবাব আলীবর্দি খাঁ খুবই বিচলিত হন। তিনি ঘটনাটি জানবার পর ইমামের সঙ্গে আলোচনা করে মিমাংসার সূত্র বের করেন, হীরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে সমস্যার সমাধান সহজেই হয়ে যায়। হীরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তার নতুন নাম করণ করা হয় আলেয়া।
“মোহনলালের বোন যে সিরাজের স্ত্রী ছিলেন সে কথা নিখিলনাথ রায় উল্লেখ করেন। তবে তার নাম বলেন নি।”

১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ জুন মিরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে পলাশির যুদ্ধক্ষেত্রে যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় তখনই মোহনলাল নবাবের বিপর্যয় আঁচ করতে পারেন। তাঁর নিজের ও ছয় বছরের সিরাজ পুত্রের জীবন বিপন্ন হতে পারে এমন আশঙ্কা তিনি করেন। তাই মোহনলাল দেরি না করে নাবব পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে মুর্শিদাবাদ ত্যাগ করেন। তাঁরা পদ্মা নদী পাড় হয়ে ময়মনসিংহের জমিদারি অন্তর্ভুক্ত বোকাই নগর দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেন । ‘রেনেলেকৃত বাংলাদেশের প্রাচীন মানচিত্রে’ ময়মনসিংহ জেলায় বোকাই নগর গ্রামের উল্লেখ পাওয়া যায়।

ক্লাইভ ও মিরজাফর গুপ্তচর পাঠিয়ে তাদের ধরবার চেষ্টা করছে, এই খবর পেয়ে মোহনলাল বোকাই নগরে তাদের নিরাপদ মনে করেন নি। মোহনলালের বিশ্বস্ত সঙ্গী বাসুদেবের কাকা বিনোদ রায় আমহাটি গ্রামে বাস করতেন। মোহনলাল সিরাজেরপুত্রকে সেই বাড়িতে রেখে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেন। মোহনলাল সিরাজ পুত্রকে দত্তক রাখার জন্য ময়মনসিংহের জমিদার কৃষ্ণকিশোর চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলেন। তিনি সম্মতি দান করেন। কারণ তাঁর ছোটভাই কৃষ্ণগোপাল দুবার বিবাহ করেও নিঃসন্তান ছিলেন। কৃষ্ণকিশোর ও কৃষ্ণগোপাল কেউই জানতেন না যে তারা সিরাজ পুত্রকে দত্তক নিচ্ছেন। তারা জানতেন যে বাসুদেবের কাকা আমহাটির বিনোদ রায়ের দ্বিতীয় ছেলেকে তারা দত্তক নিচ্ছেন। যথারীতি অনুষ্ঠান করে কৃষ্ণগোপাল এই পুত্রকে দত্তক নেন এবং তার নামকরণ করা হয় যুগল কিশোর রায়চৌধুরী। এই দত্তক পুত্র কৃষ্ণ গোপালের পিণ্ডাধিকারী ও উত্তরাধীকারী হন। এই ভাবে সিরাজ উদ দৌলা ও আলেয়ার পুত্র ভিন্ন নামে পরিচিত হন। এই তথ্য মোহনলাল ও তাঁর দুই সঙ্গীছাড়া কারও জানা সম্ভব ছিলোনা।

পরবর্তীতে কৃষ্ণকিশোর রায় ও গোপাল কিশোর রায় মারা যাবার পর যুগল কিশোর রায় জমিদারি লাভ করেন। এবং দাপটের সঙ্গে তা পরিচালনা করেন। প্রজারা তাকে ভয় ও শ্রদ্ধা করতো। কিন্তু সে সুখ বেশিদিন সইলো না। সিন্ধ্যা পরগনার মুসলিম জমিদার ও তাঁর দস্যু দমন করতে গিয়ে বেশ জটিল মামলায় পড়েন যুগল কিশোর রায় চৌধুরী। অবশেষে মামলায় তিনি নির্দোষ প্রমানিত হলেও তার অনেক আর্থিক ক্ষতি হয়। সেই সময় দুই বিধবাও তার সাথে সদ্বাচরণ করেন নি। তারা যুগল কিশোরের বিরুদ্ধে মামলা করেন এবং সম্পত্তির অর্ধেক তাদের নামে নিয়ে নেন। সামাজিক ও পারিবারিক বিপর্যয়ের কারণে যুগল কিশোর খুবই মর্মাহত হন। তিনি ময়মনসিংহের গৌরিপুর ছেড়ে সিলেটের কাজলশহর (বর্তমানে কাজলশাহ) এসে জমিদারি ক্রয় করেন। যুগল কিশোর ফরিদপুর জেলার অন্তর্গত যাদপপুর গ্রামের ভট্টাচার্য বংশের রুদ্রাণী দেবীকে বিবাহ করেন। তারই গর্ভে হরকিশোর ও শিব কিশোর নামে দুই পুত্র এবং অন্নদা, বরদা, মোক্ষদা ও মুক্তিদা চার কন্যা জন্মগ্রহণ করে। শিবকিশোর ও হরকিশোর খুব অল্প বয়সেই মার যায়। রুদ্রানীদেবীর কোনো পুত্র সন্তান না থাকায় যুগল কিশোর রায় পুনরায় বিবাহ করেন। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম যমুনা দেবী। যুগল কিশোর রায় ও যমুনা দেবীর প্রাণকৃষ্ণনাথ নামে এক পুত্র ছিল। যুগল কিশোর তাঁর জীবনের অন্তিম সময়টুকু এই সিলেট শহরে কাটান। যুগল কিশোরের শেষ ইচ্ছানুযায়ী কাজল শহরের পারিবারিক জমিদারিতে একান্ত গোপনে তাঁর মরদেহ কবর দেয়া হয়। মৃত্যুর পূর্বে তাঁর জীবন বৃত্তান্ত ও তাঁর শেষ ইচ্ছার কথা পুত্র প্রাণকৃষ্ণনাথের কাছে ব্যক্ত করেন। যুগল কিশোর রায় ও নিজের প্রকৃত বংশ পরিচয় জানতে পেরে প্রাণকৃষ্ণ বিস্মিত হন। ব্রিটিশ শাসন কালে এই তথ্য গোপনীয়তা বজায়রাখা সর্ম্পকে তিনি বিশেষ ভাবে সচেতন ছিলেন।

২. যুগলকিশোরের পুত্র প্রাণকৃষ্ণনাথ রায় চৌধুরী সিলেটের উন্নতির জন্য অনেক কাজ করেছেন। তিনি সিলেটে লেক তৈরি এবং যুগল টিলা আখড়া তৈরি করতে জমি দান করেন। যুগল টিলায় বর্তমানে ইস্কনের বড় একটি কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। প্রাণকৃষ্ণনাথ রায় চৌধুরীর প্রথম পুত্র কাজল ১২ বছর বয়সে মারা যায়। তাঁর দ্বিতীয় পুত্র হল শৌরীন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী। শৌরীন্দ্র ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে নিজেকে সম্পৃক্ত করায় ব্রিটিশ প্রশাসকদের কাছে তিনি সন্দেহভাজন ছিলেন।
কৃষ্ণনাথ রায় তাঁর পিতার বংশ ও পরিচয় শৌরীন্দ্র কে খুলে বলেন। এই কারণে এমন কিছু করা উচিত নয় যাতে সমস্ত পরিবার বিপন্নহয়ে পড়ে। গোপনীয়তা রক্ষা করে তারা দীর্ঘদিন ধরে চলেছেন। শৌরীন্দ্র পারিবারিক অবস্থা উপলব্ধি করতে পারেন। তিনি দুবার নাম পরিবর্তন করে এই অবস্থা থেকে অব্যাহতি লাভ করেন এবং পড়াশোনায় নিমগ্ন হন। শৌরীন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী প্রথমে হন প্রসন্ন চন্দ্র রায় চৌধুরী পরে নাম পরিবর্তন করে হন প্রসন্ন কুমার দে। শৌরীন্দ্র প্রসন্ন রায় চৌধুরী নামে কলকাতার হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি জুনিয়র স্কলারশিপ লাভ করেন। এই কলেজ থেকে বি.এ ডিগ্রি লাভ করেন। এই হিন্দু কলেজ পরবর্তিতে প্রেসিডেন্সি কলেজে রূপান্তরিত হয়।

উল্লেখ্য, শৌরীন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী, প্রসন্নচন্দ্র রায়চৌধুরী ও প্রসন্ন কুমার দে একই ব্যক্তি ছিলেন।
শৌরিন্দ্র কিশোরের তিন স্ত্রী ছিল। তাঁর প্রথম স্ত্রী ত্রিপুরেশ্বরী দেবীর উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী নামে এক পুত্র সন্তান ছিল। এই স্ত্রী হঠাৎ সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে মারা যান। স্ত্রীর পিতার বাড়ির লোকেরা সন্দেহ করেন শৌরিন্দ্র কিশোর ই এ মৃত্যুর জন্য দায়ী। তারা থানায় ডায়েরীও করেন এবং উপেন্দ্রকে তাদের কাছে নিয়ে যান। উপেন্দ্র বরিশালেই বড়ো হয়। তদন্ত করে পুলিশ এই মৃত্যুকে আকস্মিক দুর্ঘটনা মনে করে প্রসন্ন কুমার কে বিব্রত করেনি। তিনি আবার বিবাহ করেন। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মোহিনীর দুই পুত্র ও এক কন্যা ছিল। তাঁর প্রথমপুত্রের নাম নলিনী কিশোর পরে নাম পরিবর্তন করে বিজয় কুমার রাখেন। তিনি আবারও নাম পদবী পরিবর্তন করে বিজয় কুমার থেকে লালা বিজয় কুমার দে হন। প্রসন্ন কুমারের দ্বিতীয় পুত্র হেমন্ত কুমার। ইতিমধ্যে প্রসন্ন কুমারের প্রথম স্ত্রীর ভাই পুলিশ বিভাগে যোগদান করে সিলেটে বদলি হয়ে আসেন। এসেই তিনি তাঁর বোনের মৃত্যুর ঘটনা পুনঃতদন্ত শুরু করেন। এই অবস্থায় প্রসন্ন কুমার দে বিপদ আশঙ্কা করেন। কাজল শাহর জমিদারি ম্যানেজারের দায়িত্বে দিয়ে সুনামগঞ্জে জমিদারি কিনে সেখানে চলে যান। এবং নাম পরিবর্তন করেন প্রসন্ন চন্দ্র থেকে প্রসন্ন কুমার দে। এদিকে ম্যানেজারের বিশ্বাসঘাতকতার কারনে কাজল শার জমিদারি হাতছাড়া হয়ে যায় প্রসন্ন কুমারের।

প্রসন্ন কুমারের দ্বিতীয় স্ত্রী মারা গেলে তিনি আবার বিয়ে করেন। এই তৃতীয় স্ত্রী হীরন্ময়ীর গর্ভে ছয়টি পুত্র ও একটি কন্যা সনতানের জন্ম হয়। পুত্রদের নাম ছিল পূর্ণেন্দু, ঘনেন্দু, নীরেন্দু,শরদিন্দু, প্রশান্ত ও নওয়াল কুমার। প্রসন্নকুমার সুনামগঞ্জে ‘জুবলি স্কুল’ নামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। পরে তা মাধ্যমিকে রূপান্তরিত হওয়ায় কলেবর বৃদ্ধিপায়। তিনি তাতে প্রথম অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। সুনামগঞ্জের জুবলি স্কুল যতেষ্ট সুনাম অর্জন করে। তিনি সুনামগঞ্জে প্রথম প্রিন্টিং প্রেস ‘জুবিলি প্রিন্টার্স’ স্থাপন করেন।

প্রসন্নকুমার দে তাঁর বংশধরদের জন্য যেসব তথ্য রেখে যান তাতে এই্ বংশধারা সর্ম্পকে স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়। তিনি সুনামগঞ্জের একজন সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে ৮৫ বছর বয়সে সুনামগঞ্জে প্রয়াত হন।

মামুন পারভেজ, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী

 

এ জাতীয় সংবাদ

তারকা বিনোদন ২ গীতাঞ্জলী মিশ্র

বাংলা দেশের পাখী

বাংগালী জীবন ও মূল ধারার সংস্কৃতি

আসছে কিছু দেখতে থাকুন

© All rights reserved © 2021 muktokotha
Customized BY KINE IT