1. muktokotha@gmail.com : Harunur Rashid : Harunur Rashid
  2. isaque@hotmail.co.uk : Harun :
  3. harunurrashid@hotmail.com : Muktokotha :
মাতৃভাষা ও জাতীয়তাবোধ - মুক্তকথা
শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০২৪, ০৩:০৩ পূর্বাহ্ন

মাতৃভাষা ও জাতীয়তাবোধ

সংবাদদাতা
  • প্রকাশকাল : মঙ্গলবার, ২৭ জুন, ২০১৭
  • ৫৯৭ পড়া হয়েছে

মিনহাজ আহমদ

বাদল হাসিব নিউ ইয়র্কের একটি বেসরকারি প্রাথমিক স্কুলে বাংলা শেখান। সেদিন তার একটি সমস্যার কথা বললেন। তার ক্লাসের অধিকাংশ শিক্ষার্থী সিলেটি। ওরা বাংলা বলে সিলেটি উচ্চারণে। কথা বলার সময় অনেক সিলেটি শব্দ ব্যবহার করে, এমনকি লিখিত ভাষায়ও সিলেটি ভাষার শব্দ ঢুকিয়ে দেয়। একজন শিক্ষার্থী ইংরেজি বয় শব্দের বাংলা করেছে পুয়া। এ ধরনের মিশ্রণদোষে বাংলা শেখানো বাধাপ্রাপ্ত হয় বলে বাদল জানালে
সমস্যাটার কথা শুনে আমার হাসি পেলো। হাসির কারণ আমার নিজ জীবনের একটি ঘটনার স্মৃতি মনে পড়ে যাওয়া। আমি যখন দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ি, তখন পরীক্ষায় পাঁচটি আঁশহীন মাছের কথা লিখতে বলা হয়েছিলো। আমি তখন গুয়াল (বোয়াল), ঘুঙ্গি (ট্যাংরা), পাবিয়া (পাবদা) ইত্যাদি শব্দগুলো লিখেছিলাম। আমি সিলেটি, তাই আমার মাতৃভাষা বা জন্মগত (নেটিভ) ভাষা সিলেটি, স্বাভাবিকভাবেই মনে, মুখে এবং কলমে প্রথমেই যা উঠে আসে, তা হয় সিলেটি। সেবার বাড়ি ফিরে যখন সবাইকে বললাম কি লিখেছি, তখন সবাই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করেছিল।
মাতৃভাষার এমন ব্যবহারটাই স্বাভাবিক। এর কারণ, ভাষার মূল বৈশিষ্ট্যগুলো আসলেই জন্মগত বা জিনবাহিত। এই যে আপনারা দেখেন কিছু সিলেটি পরিবার, যারা আদাজল খেয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন সন্তানদের সিলেটি না শিখিয়ে শুদ্ধ বাংলা শেখাতে, তারা কি শেষ পর্যন্ত কামিয়াব হন কুলে উঠতে? আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এ ধরনের চাপিয়ে দেওয়া বুলি খুব কম সংখ্যক ছেলেমেয়ে যথাযথভাবে রপ্ত করতে পার অন্যরা না-সিলেটি-না-বাংলা এক ধরনের দোআঁশলা ভাষায় কথা বলতে শেখে। ফলে একটা ভাষাগত হাস্যরসের জন্ম হয়। এই দোআঁশলা প্রজন্ম না পারে শুদ্ধ সিলেটি শিখতে, না পারে শিখতে শুদ্ধ বাংলা; এরকম ইংরেজি বাংলা দোআঁশলা ভাষায় কথা বলা ছেলেমেয়েতেওর সংখ্যাও আমাদের দেশে অনেক
ভাষা নিয়ে অনেকগুলো কৌতুক আমাদের দেশে আছে, সেগুলো থেকে ছোট্ট একটার কথা বলি বর্ণমালা শেখানর জন্য এক শিক্ষক তার ছাত্রকে জপ করাচ্ছিলেন, “ব-য়ে হ্রস্ব ই-কারে বি, ড়-য়ে আ-কারে ড়া, আর ল” শিক্ষক ‘বিড়াল”  বলার আগেই শিক্ষার্থী বলে উঠে “মেকুড়”; মেকুড় সিলেটি ভাষায় বিড়ালের আরেক নাম শিক্ষার্থী জানে, বানান যেভাবেই করা হোক না কেনো, ওটা মেকুড়ই এই শিক্ষা সন্তানের আদি ও সবচেয়ে নিকটবর্তী সার্বক্ষণিক শিক্ষক হিসেবে পিতামাতা নিজেদের অজান্তেই সন্তানদের অবচেতন মনে রোপন করে দেন এ শিক্ষার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকে পিতামাতার নিজস্ব ভাষাগত বৈশিষ্ট্য, যেমন পিতামাতা নিজেরা কোন্ পরিভাষা ব্যবহার করেন, তাদের কণ্ঠস্বরের উঠানা ও বাচনভঙ্গী কেমন, ইত্যাদি এর অতিরিক্ত হিসেবে যদি শিক্ষক কিংবা পিতামাতা ভিন্ন কোন পরিভাষা বা স্বর-বৈশিষ্ট্য সন্তানকে শেখাতে চান, সন্তানকে সেটা আয়ত্ত করতে অধিক সময় ও শ্রম দিতে হবে এক কথায় “মেকুড়” সরিয়ে সেখানে “বিড়াল” অধিষ্ঠান করতে সন্তানকে অধিক সময় দিতে হয় ফলে এসব শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া তুলনামূলকভাবে বিলম্বিত হয়
সমস্যাটার দিকে আমার চোখ পড়েছিল আরেকটি ঘটনায়। আমার এক ভাগ্নে বিলেত থাকে। সে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াকালে বাবা-মার সাথে বিলেত গিয়েছিল। মেধাবী ছাত্র, প্রশ্নের উত্তরে সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত থামতে চায়না। একবার সে ঢাকা বেড়াতে এসে প্রশ্ন করেছিল, আইচ্ছা ছুটো মামা, আমরা কিতা বাংলা মাতিনানি? (আমরা কি বাংলায় কথা বলিনা?) তার প্রশ্ন করার কারণ, ওর মা ওকে শিখিয়ে দিয়েছেন, ঢাকায় দোকানে কোন কিছু কিনতে গেলে সে যেন নিজে দরাদরি না করে তার খালাতো ভাইবোন বা আমরা যারা দেশে থাকি, তাদের কাউকে বলে। সেই ছেলেটি এখন অনেক বড় হয়েছে, বিলেতের একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছে, কিন্তু বাংলাভাষা বলতে সে মূলতঃ জানে সিলেটি ভাষা। আমার মনে পড়ে ‘বাই এয়ার মেইল’ লেখা আকাশী রঙের এয়ার লেটারে তার নানা-নানীকে লেখা চিঠির কথা। সে বাংলা অক্ষরে উদ্ভট বানানে অর্ধেক সিলেটি, অর্ধেক বাংলা’য়  চিঠি লিখে মনের ভাব প্রকাশ করতো।
বিলেতের প্রসঙ্গ উঠিয়েছি আরেকটি কারণে। আমরা জানি, বিলেতের বাংলাদেশিদের অধিকাংশই মূলতঃ সিলেট এলাকা থেকে এসেছেন। অবিভক্ত ভারতে শিক্ষায়-দীক্ষায়, ইতিহাস-ঐতিহ্যে সিলেট অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি জনপদ হিসেবে এক সময় পরিচিত ছিলো এক সময় আর্থিক সমৃদ্ধির আশায় সিলেটের বিপুল সংখ্যক মানুষ লন্ডন পাড়ি জমিয়েছিলেন এদের অধিকাংশই ছিলেন বয়সে নবীন, অনেকেই অল্পশিক্ষিত বা অশিক্ষিত, বেশিরভাগই খেটে খাওয়া মানুষ; কালক্রমে এই লোকগুলো তাদের রাষ্ট্রিক (রাজনৈতিক) পরিচয়বাহিত সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, পরিবেশ, বিশেষ করে তাদের রাষ্ট্রভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো। ফলে তারা ভুলে গেল ‘আসছি’ ‘যাচ্ছি’ ‘ছেলে’ ‘মেয়ে’ ইত্যাদি শুদ্ধ বাংলা, কিন্তু ভুলেনি ‘আরাম’ ‘যাইরাম’ ‘পুয়া’ ‘পুরি’ ইত্যাদি শুদ্ধ সিলেটি। অর্থাত, প্রজন্মান্তরে রাষ্ট্রভাষার সাথে ব্যবধান লোপ পেলেও তাদের মাতৃভাষা টিকে থেকেছে। এর কারণ উপরেই বলেছি, মাতৃভাষার বৈশিষ্ট্যগুলো জন্মগত বা জিনবাহিত বলে দীর্ঘস্থায়ী। অপরপক্ষে রাষ্ট্রভাষার সাথে মানুষের সম্পর্ক আরোপিত শক্তিশালী বলে রাষ্ট্রশক্তি মানুষের উপর  আরও অনেক কিছুর মতো ভাষাকেও জবরদস্তিমূলকভাবে চাপিয়ে দেয় কিন্তু মানুষের মাতৃভাষার অধিকার অন্যসব জন্মগত অধিকারের মতো শত প্রতিকূলতার মাঝেও টিকে থাকে এজন্যই বৃটিশ-ভারতীয়-পাকিস্তানী শাসনের দমণ-পীড়ণ সত্ত্বেও বাংলাদেশে চাকমা, গাড়ো, মনিপুরি ইত্যাদি ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস আজও বিলুপ্ত হয়নি একই কারণে স্বাধীন বাংলাদেশে এদেরকে বাঙালি হতে আহ্বান জানান হলেও ওরা বাঙালি হয়নি বা হতে পারেনি তারা আপন সংস্কৃতি, রীতি-নীতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ভাষা নিয়ে ঠিকই টিকে  আছে এবং সাম্প্রতিক যুগে তাদের নিজস্ব ভাষা আপন মহিমায় মূল্যায়ন হচ্ছে নিজ ভূমিতে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যেই এর আগে প্রক্রিয়াটির সূত্রপাত হয়েছিল পার্বত্য শান্তি চুক্তির মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসনচুক্তির মধ্য দিয়ে, অতি সম্প্রতি যার সম্প্রসারণ হয়েছে ভাষার অধিকারের স্বীকৃতি প্রদান করে বর্তমান বাংলাদেশে সরকারের অধীনে এই ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর মাতৃভাষায় বই ছাপা হচ্ছে, স্কুলে সে ভাষায় পড়ালেখা করার সুযোগ পাচ্ছে আগামীতে তাদের অফিস-আদালতেও হয়তো সে ভাষা ব্যবহৃত হবে
বাংলাদেশে ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলো তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, স্বায়ত্তশাসন ইত্যাদির অধিকার ফিরে পাচ্ছে, সেটা অত্যন্ত আনন্দের বিষয় হলেও সিলেটি ভাষার মতো একটি পূর্ণ বিকশিত ভাষার ক্রম অবলুপ্তি বেদনাদায়ক অথচ এক সময় এই সিলেটি লিপি নাগরিতেই সিলেটি ভাষায় প্রচুর সাহিত্য রচিত এবং মুদ্রিতও হয়েছে; মূদ্রণশিল্পেও বাংলার চেয়ে সিলেটি ভাষা মোটেও পিছিয়ে ছিলোনা বাংলা, অহমিয়া, উড়িয়া, ইত্যাদি কাছাকাছি অঞ্চলের ভাষাগুলোর প্রায় সমসাময়িক ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ভাষা হওয়া সত্ত্বেও শুধু রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সিলেটি ভাষা আজ প্রায় অবলুপ্তির পথে
তবে একটা মজার কথা হলো, নিজ দেশে সিলেটি ভাষা অপাংক্তেয় হয়ে গেলেও বিলেতে বাংলার চাইতে সিলেটি ভাষার মর্যাদা অধিক এবং সে মর্যাদা আদায় করতে গিয়ে দস্তুর মতো বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে আরেকটি ভাষা আন্দোলন করতে হয়েছে সিলেটিদেরকে বিলেতে সিলেটি ভাষা বিভিন্ন সরকারি অফিস-আদালত, স্কুল কলেজ ইত্যাদিতে ফরাসি-স্প্যানিশ-জার্মান ভাষার মতো দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে এ ভাষা নিয়ে অনেক বাঙালি, সিলেটি এবং বৃটিশ পণ্ডিত অনেকে গবেষণা করছেন ইতিমধ্যে কমপিউটারে ব্যবহারের জন্য তৈরি হয়েছে সিলেটি ফন্ট সে ফন্ট ব্যবহার করে অবলুপ্তপ্রায় মূল্যবান প্রাচীন সিলেটি সাহিত্যকে নতুন করে জীবন দান করা হচ্ছে সিলেটি ভাষার চর্চা, প্রশিক্ষণ এবং প্রসারের জন্য রচিত হয়েছে সিলেট’ ভাষার ব্যাকরণ
আমি আমার এ লেখার সমাপ্তি টানবো একটি যুক্তি উপস্থাপন করে যুক্তিটি হলো:
যদি-
(১)  মাতৃভাষাই শিক্ষার উত্কৃষ্ট বাহন হিসেবে স্বীকৃত হয়; এবং
(২) সিলেটি একটি পূর্ণাঙ্গ সচল ভাষা হয়ে থাকে এবং সে ভাষা যদি সিলেট অঞ্চলের মানুষদের মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃত হয়;
তাহলে-
(৩) সিলেটি ভাষাই হবে সিলেটিদের শিক্ষার বাহন
বিলেতে সিলেটিরা যেভাবে সিলেটি ভাষার জন্য অব্যাহতভাবে কাজ করে চলেছেন, এবং অন্যদিকে বিশ্বসভায় যেভাবে সকল মানুষের পৃথক ভাষা, সংস্কৃতি, স্বায়ত্তশাসন ও মানবাধিকার দিন দিন অধিক উদারভাবে স্বীকৃতি লাভ করছে, অদূর ভবিষ্যতে আশা করা যাচ্ছে সিলেটি ভাষাকে অবল্বমন করে সিলেটি সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবোধও গড়ে উঠবে

এ জাতীয় সংবাদ

তারকা বিনোদন ২ গীতাঞ্জলী মিশ্র

বাংলা দেশের পাখী

বাংগালী জীবন ও মূল ধারার সংস্কৃতি

আসছে কিছু দেখতে থাকুন

© All rights reserved © 2021 muktokotha
Customized BY KINE IT