1. muktokotha@gmail.com : Harunur Rashid : Harunur Rashid
  2. isaque@hotmail.co.uk : Harun :
  3. harunurrashid@hotmail.com : Muktokotha :
“মূলত বাঙালি সংস্কৃতি হলো তান্ত্রিক সংস্কৃতি” - মুক্তকথা
শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০২৪, ১১:১৯ পূর্বাহ্ন

“মূলত বাঙালি সংস্কৃতি হলো তান্ত্রিক সংস্কৃতি”

পুনঃপ্রকাশ॥
  • প্রকাশকাল : শনিবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২১
  • ৮৪৯ পড়া হয়েছে
দ্রাবিড় সৈকত

দ্রাবিড় সৈকত। কবি, চিত্রকর এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষক। গত ৩০ জুলাই ২০২১ তারিখে তার এই সাক্ষাৎকারটি নরসিংদীর মুখপত্র “ব্রহ্মপুত্র” প্রকাশ করেছিল। দ্রাবিড় সৈকত মূলত, কবিতা ও চিত্রকলার পাশাপাশি বাঙালি, বাঙালি সংস্কৃতি, বাংলা অঞ্চল ইত্যাদি নিয়ে দীর্ঘদিন যাবত গবেষণা করছেন এবং এসব বিষয়ে নানা পত্রিকায় লেখালেখি অব্যাহত রাখছেন। তার এ লেখা থেকে জানতে পারা যাবে বাঙালির এক নবতর অধ্যায় সম্বন্ধে। খুব শীঘ্রই এ-বিষয়ে তাঁর একটি গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশিত হবে বলে আমরা শুনেছি। উল্লেখ্য যে, দ্রাবিড় সৈকতের জন্ম ও বেড়ে ওঠা নরসিংদী জেলার মাধবদীর টাটাপাড়া গ্রামে।
তার লেখালেখির তেজ দেখে আমরা আকৃষ্ট হয়ে এ  লেখাটি এখানে পত্রস্ত করলাম। -সম্পাদক

জুলাই ৩০, ২০২১

আমার প্রথম প্রশ্ন এবং মূল ব্যাপারটা এটাই যে, বাঙালি সংস্কৃতি বলতে আমরা আসলে কী বুঝি?

দ্রাবিড় সৈকত : আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির ব্যাপারে সবচেয়ে বড়ো যে-সমস্যাটা আমি মনে করি, সেটা হলো বাঙালি সংস্কৃতি সম্পর্কে আমাদের বোদ্ধামহল বহু বিষয়ে একমত হতে পারেননি। না পারার প্রধান কারণ হলো বাঙালি সংস্কৃতিকে হিন্দু সংস্কৃতি, মুসলিম সংস্কৃতি, বৌদ্ধ সংস্কৃতি এবং আরো অন্যান্য ধর্মীয় সংস্কৃতির সাথে মিলিয়ে দেখার একটা প্রচেষ্টা। এ-সমস্ত প্রচেষ্টা থাকার কারণে কেউই আসলে বাঙালি সংস্কৃতি সম্বন্ধে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। এবং যারাই বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলেছেন বা কাজ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে আরেকটি দল বা মত দাঁড়িয়ে গেছে।

মূলত বাঙালি সংস্কৃতি হলো তান্ত্রিক সংস্কৃতি। এখন তান্ত্রিক সংস্কৃতি বলার সাথে সাথে মানুষের মনে হবে, তন্ত্র তো হিন্দু ধর্মের, তন্ত্র তো বৌদ্ধ ধর্মের অথবা তন্ত্র তো ইসলাম ধর্মের। কিন্তু বিষয়টা এমন না, বিষয়টা হলো এ-অঞ্চলের মানুষ শুরু থেকেই তন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলো। এখন তান্ত্রিকতা কী বা কেমন, সেটা তন্ত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করতে হবে। তন্ত্রের উৎপত্তি একেবারে কৃষির জন্মের সাথে সম্পৃক্ত। এখানে ফসল যে দেয়, খাদ্যের যোগান যে দেয় কিংবা প্রজনন ক্ষমতা যার আছে, তাকেই আমরা সম্মান করি, শ্রদ্ধা করি। বিভিন্ন ধর্ম এসে কোনোটা একে পূজায় রূপান্তরিত করেছে, কোনোটা প্রার্থনায় রূপান্তরিত করেছে অথবা আধ্যাত্মিক বিভিন্ন ফর্মে রূপান্তরিত করেছে। বাংলায় যতো ধর্ম আছে, তাদের কোনোটাই তান্ত্রিকতাকে অস্বীকার করতে পারেনি। ফলে এ-অঞ্চলে আপনি দেখবেন, ইসলামে প্রচুর পীর-মুরিদী। এটা আসলে তান্ত্রিক গুরু-শিষ্য পরম্পরা। গুরু-শিষ্য পরম্পরা তান্ত্রিকতায় খুবই জরুরী বিষয়। তন্ত্র বললেই আমরা এখন কী বুঝি? আমাদের শিক্ষিত মহলও তন্ত্র বলতে মনে করেন ঝাড়ফুঁক-জাদুটোনা-তাবিজ-কবচ, গুপ্ত সাধন, দেহ সাধন, ডাকিনীবিদ্যা ইত্যাদি। এখন দেহ সাধন কী? এটিই আমরা এখনো বুঝতে পারিনি। দেহ সাধন আমাদের এই অঞ্চলে নানান ফর্মে রয়েছে। দেহ কী? সমস্ত প্রত্যঙ্গ মিলেই দেহ। দেহে আমার মস্তিষ্ক আছে, হৃদপিণ্ড আছে, হাত আছে, পা আছে, আমার যৌনাঙ্গ আছে— এই সবকিছু মিলিয়ে দেহ। কিন্তু দেহতত্ত্বকে যদি আমি যৌনতত্ত্ব বলি, তাহলে আমার বাকি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে আমি তো মূল্যায়নই করলাম না। তন্ত্র এভাবে কখনো দেখে না। তন্ত্রের মূল বিষয় হলো দেহকে পৃথিবীর উপযোগী করা। তন্ত্র বলে, যা আছে দেহ ভাণ্ডে, তা আছে ব্রহ্মাণ্ডে। “ব্রহ্মাণ্ডে যে গুণাঃ সন্তি তে তিষ্ঠন্তি কলেবরে”।

তন্ত্র পৃথিবীকে দেখে দেহের সাপেক্ষে। তার মানে দেহ একটা ছোটো ব্রহ্মাণ্ড। আবার বিশ্বব্রহ্মাণ্ড আরেকটা। যখন আমরা তন্ত্র দ্বারা দেখি, তখন কোনোকিছুকেই আমরা দেহের বাইরের ভাবি না। প্রকৃতি কিংবা অন্যান্য প্রাণিকুল বা উদ্ভিদকুল— সবকিছু আমাদেরই অংশ। যার ফলে আমাদের মানুষজন পরস্পরের প্রতি সহনশীল। হিংসাত্মক মনোভাব নেই। আপনি দেখবেন, এই অঞ্চল থেকে যতো ধর্ম ও মতের উৎপত্তি হয়েছে, তাদের মধ্যে ‘অহিংসা’ একটা মূল ব্যাপার হিসেবে ক্রিয়া করে। আপনি যখন পুরো পৃথিবীকে দেহের অংশ হিসেবে দেখবেন, আপনার নিজের অংশ হিসেবে দেখবেন, তখন আপনি কাকে হিংসা করবেন? ডানহাত তো বামহাতকে হিংসা করতে পারে না, তাদের কাজ আলাদা আলাদা, কেউ শ্রেষ্ঠ বা নিকৃষ্ট নয়। তো প্রকৃতি এবং সবকিছু আমারই অংশ। নিজের অংশের সাথে তো আমার হিংসাত্মক সম্পর্ক হতে পারে না। আমার সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক থাকবে। যার ফলে আমাদের এই অঞ্চলের মানুষজন পুরোই তান্ত্রিক, আমাদের আচার-আচরণ জেনে বা না জেনে তান্ত্রিক মতাদর্শই অনুসরণ করছে। এবং আমাদের সংস্কৃতি যদি খুঁজতে হয়, তাহলে তন্ত্রের প্রথা-পদ্ধতির ভেতরই খুঁজতে হবে এবং ধারণ করতে হবে। আমরা যদি তন্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে না পারি, তাহলে আমরা কখনো হিন্দু হবো, কখনো মুসলিম হবো, কখনো বৌদ্ধ হবো। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ইসলাম— চারটা ধর্মই এখানে এসে তান্ত্রিক হতে বাধ্য হয়েছে। ফলে আপনি দেখবেন, বৌদ্ধদের মহাযান বা বজ্রযান, হিন্দু ধর্মের শাক্ত ও বৈষ্ণব, ইসলাম ধর্মের সুফিবাদ বা পীর-মুরিদী প্রথা— এ-সমস্ত কিছুই তান্ত্রিক। এখনো আমরা যতো ওষুধপত্র ব্যবহার করি, এর ৭২ শতাংশই তান্ত্রিক। এই মতটি আমার নয়। এই মতটি আর্থার এভেলন নামে এক ভদ্রলোকের, যাকে পশ্চিমা তন্ত্রশিক্ষার জনক বলা হয়। কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ছিলেন তিনি। পশ্চিমে বর্তমানে তন্ত্র খুব জনপ্রিয়। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্ব যেহেতু ভোগবাদী, তারা তন্ত্রকেও ঠিক ভোগের অংশ হিসেবে তৈরি করে নিয়েছে। আপনারা জানেন যে, তন্ত্রে ‘পঞ্চমকার’ নামে একটি সাধনা আছে। মদ্য, মাংশ, মৎস, মুদ্রা, মৈথুন— এই পাঁচটি বিষয়কে তন্ত্র খারিজ করে দেয় না। সবকিছুই মানুষের জীবনে প্রয়োজনীয় এবং সেগুলোর ব্যবহার আপনার জীবনে কেমন হবে, তা তান্ত্রিক পদ্ধতিতে বর্ণিত আছে। এই তন্ত্র বাঙালি সংস্কৃতির পরতে পরতে আছে। কিন্তু যখন আমরা ধর্মীয় দৃষ্টিতে দেখি, তখন আমাদের মনে হয়, এগুলো তো হিন্দুদের সংস্কৃতি, মুসলিমরা এগুলো পালন করতে পারবে না। অথবা এগুলো তো মুসলিমদের সংস্কৃতি, হিন্দুরা এসব পালন করতে পারবে না। আবার মনে হতে পারে যে, এসব বৌদ্ধ সংস্কৃতি, সুতরাং হিন্দু-মুসলিমদের এসব পালনে বাধা আছে। কিন্তু শেষতক, পুরো বৃহৎ বঙ্গের দৃষ্টিভঙ্গিতে এখানে তান্ত্রিক সভ্যতার বাইরে কিছুই নেই। বাইরের মতাবলম্বী যারাই এসেছে, তারা তন্ত্রের সাথে আপোষ করেই এসেছে। তো, এই হলো আমার কথা, আমাদের যদি বাঙালি সংস্কৃতি বুঝতে হয়, তাহলে আমাদের তন্ত্র সম্পর্কে জানতে হবে সবার আগে।

তন্ত্রের সময়কাল নিয়ে আপনি আসলে কী বলবেন? কারণ, বাঙালির ঐতিহ্য বলতে আসলে এক থেকে দেড় হাজার বছরের একটা কালপঞ্জিই চিহ্নিত হয়ে এসেছে। তাহলে তন্ত্রের বিস্তার আপনি কতোদূর এবং কীভাবে চিহ্নিত করবেন?

দ্রাবিড় সৈকত : এই বিষয়ে আসলে প্রচুর বিস্তারিত কথা আছে। সম্ভবত এতোটা বিস্তারিত এখানে বলা যাবে না। প্রথমত, আমাদের ইতিহাস বইগুলোতে যা আছে, একেবারে নীহাররঞ্জন রায়, দীনেশচন্দ্র সেন, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত যারা আছেন, প্রত্যেকেই কিছু কিছু ইঙ্গিত দিয়েছেন। পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় কিছু ইঙ্গিত দিয়েছেন, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কিছু ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে তারা কেউই তন্ত্রের মূলে ঢোকেননি। আবার আহমদ শরীফ যেমন বলেছেন, বাঙালি ব্যক্তির ধর্ম হলো সাংখ্য, তন্ত্র, যোগ। সেক্ষেত্রে আপনি যদি ইতিহাসের কথা বলেন, তাহলে বলবো, অনেকেই ইঙ্গিত প্রদান করেছেন, কিন্তু তন্ত্রের ভেতর কেউ ঢোকেননি। কেননা, আধুনিক ও পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিতরা সর্বদাই তন্ত্র সম্পর্কে অচ্ছ্যুত, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের মনোভাব পোষণ করে এসেছে। তাই তন্ত্র আসলে সেভাবে চিত্রায়িত হয়নি। এবং তন্ত্রের ভেতরও কেউ প্রবেশ করেনি। এখনো প্রচুর বিভ্রান্ত (আমি ভণ্ড বলবো না) সাধক আছেন, যারা এসব করে বেড়াচ্ছেন। যেমন আয়ুর্বেদ। আয়ুর্বেদ পুরোটাই তান্ত্রিক। চড়কসংহিতা থেকে শুরু করে শ্মশ্রুসংহিতা বলেন, এগুলো তো তান্ত্রিক। হিন্দু ধর্ম নিশ্চিতভাবেই এখানে বহিরাগত।
আর্যদের দ্বারা বেদের মাধ্যমে এই ধর্ম এ-অঞ্চলে প্রবর্তিত হয়। ভারতের ইতিহাস যদি আপনি পড়েন, তবে দেখবেন অসুর আর দেবতাদের দ্বন্দ্বের ইতিহাস, যুদ্ধের ইতিহাস। অসুর কারা ছিলো? যদি আমরা মোটা দাগে দেখি, দূর্গার পায়ের নিচে আছে অসুর এবং কালীর পায়ের নিচে আছে কিন্তু শিব। এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন। ধর্মীয় দৃষ্টিতে অবশ্য একরকম ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। কিন্তু ধর্মের বাইরেও বস্তুগত (ম্যাটারিয়েল) জায়গা থেকে এগুলো ব্যাখ্যা করার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। আমাদের তন্ত্রের মূল বিষয় হলো ‘পৃথিবীর কল্যাণে কাজ করো’, ‘মানুষের কল্যাণে কাজ করো’। এর ধরনটা কেমন? প্রথমে তোমার দেহ সাধন করো। এই দেহ সাধন কী? দেহ সাধন হলো দেহকে পৃথিবীর কল্যাণে কাজ করার উপযুক্ত করে গড়ে তোলা। দেহ সাধনের তান্ত্রিক পদ্ধতি হলো যোগ। যোগ এখন খুব বেশি ধর্মের সাথে যুক্ত হয়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে এটি ধর্মের সাথে কোনোভাবেই যুক্ত না। তন্ত্র নিজেও ধর্ম না— এটা মাথায় রাখতে হবে। তন্ত্র একটা সিস্টেম; একটা পদ্ধতি— জীবনযাপনের পদ্ধতি। পরবর্তীতে দেখা গেলো, যেহেতু ধর্ম ছাড়া আমরা কিছু খুঁজে পাচ্ছি না, তাই তন্ত্রের নামকরণ হয়ে গেলো তান্ত্রিক ধর্ম। মোটেই এটা কোনো ধর্ম না। আমরা বরং এটাকে একটা মতাদর্শ বলতে পারি। তন্ত্রের যে-সাধন পদ্ধতি, তা হলো যেহেতু আমি দেহ দিয়ে প্রকৃতিকে দেখছি, তাই আমার দেহকে উপযুক্ত রাখতে হবে, সঠিক রাখতে হবে। এরজন্যে আছে যোগ, আছে প্রাণায়াম, আছে মৈথুন ও অন্যান্য ক্রিয়া পদ্ধতি। এই সমস্ত কিছু দেহকে পরিশীলিত, বিশুদ্ধ ও কাজের উপযোগী করে গড়ে তুলবে। এবং কাজটা কী? আপনি হয়তো কৃষক, আপনি কৃষিকাজ করবেন। শ্রমিকের কাজ হতে পারে। আপনি রসায়ন, প্রযুক্তি, শিল্প, জ্যোতির্বিজ্ঞানসহ পৃথিবীর সমস্ত বিষয়ে কাজ করতে পারেন। কিন্তু এখনকার তন্ত্রে যা হচ্ছে, তা হলো আমরা শুধু সাধনা করছি। কিন্তু কেনো সাধনা করছি? আমরা লক্ষ্য থেকে উপলক্ষ্যটাকে বড়ো করে তুলেছি। এর সাথে আধ্যাত্মিক বহু কিছু জড়িয়ে নিয়েছি। প্রকৃতপক্ষে অন্য কোনো কাজের সাথে সংযুক্ত হবার জন্যে দেহকে পরিশীলিত, বিশুদ্ধ এবং সমর্থ করতে হবে। তন্ত্রে কখনোই আধ্যাত্মিক কোনোকিছু ছিলো না। পরবর্তীতে ধর্মগুলো যখন এসেছে, তখন এটার উপর আধ্যাত্মিকতা নানাভাবে আরোপ করা হয়েছে। আবার অনেক তান্ত্রিকেরাও অপরাপর ধর্মগুলোর বিকল্প তৈরির উদ্দেশ্যে নানা প্রথা-মন্ত্র-জপ ইত্যাদি নিয়ে এসেছে। তবে এসব গৌণ ব্যাপার। মূলত তন্ত্র একটি সম্পূর্ণ একটিভিটি বা কার্যকলাপ সম্পর্কিত মতাদর্শ।

মূল প্রশ্ন থেকে একটু দূরে চলে গেলাম। যাই হোক, সরাসরি তন্ত্র বিষয়ে লিখিত বইপত্র পাওয়া যায় ষষ্ঠ থেকে সপ্তম শতকে। তবে অনেক গবেষক মনে করেন, যেহেতু তন্ত্রের উৎপত্তি কৃষির সাথে, সেহেতু তন্ত্রের বয়স কমপক্ষে ১০,০০০ (দশ হাজার) বছর। এখন দশ হাজার বছর কীভাবে, সেটা প্রমাণ করতে বড়ো বই লেখার বিষয় আছে। তারপরও সংক্ষেপে বলি। মূলত, কৃষির উৎপত্তির সাথে এটি সম্পর্কিত। কৃষির উৎপত্তি কখন থেকে হলো? নবোপলীয় সভ্যতা, নতুন প্রস্তর যুগের যে-বিপ্লব, সেটাই মূলত কৃষি বিপ্লব। সেই বিপ্লবের সাথে একেবারে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হলো তন্ত্র। সেক্ষেত্রে তন্ত্রের উৎপত্তির হিসেবে এর বয়স কমপক্ষে দশ হাজার বছর। আবার এখানকার হিন্দু সংস্কৃতি বা বৈদিক সংস্কৃতির কথাই ধরুন, তার বয়স সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার বছর। যদি বৌদ্ধ ধর্মের কথা বলেন, আড়াই হাজার বছর। খ্রিস্ট ধর্ম দুই হাজার বছর, ইসলাম ধর্ম দেড় হাজার বছর। এ-ধর্মগুলো প্রত্যেকটিই তন্ত্র থেকে কমপক্ষে সাড়ে ছয় হাজার বছর নতুন বা পরের। অর্থাৎ তন্ত্রের সাথে বহু ধর্মের সম্পর্ক আছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়— হরপ্পা সভ্যতার দুইটি সীলমোহর পাওয়া গেছে দুই ধরনের। এরমধ্যে একটি যোগী’র সীল। এটি অন্তত সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগের। আরেকটি সীলমোহর হলো অন্নপূর্ণা’র। পরবর্তীতে অবশ্য ধর্মগুলো অন্নপূর্ণার উপর দেবীরূপ আরোপ করেছে। সেই কারণে আমি ধর্মীয় টার্মগুলো ব্যবহার করতে চাই না। যাই হোক, মোহরে তার যোনিদেশ থেকে বৃক্ষ বের হচ্ছে। তার মানে হচ্ছে, তখন নারীকে প্রতীকায়িত করা হয়েছে অন্নদাত্রী হিসেবে। নারী আমাদের অন্ন যোগান দেয়। প্রকৃতিও তা-ই। এটার প্রমাণ নানা জায়গায় স্পষ্ট ছড়িয়ে রয়েছে। খাঁটি তান্ত্রিক প্রথা-পদ্ধতির উদ্ভব এবং প্রাচীনতার প্রশ্নে প্রত্নতত্ত্ববিদ M. C. Joshi তার The History and Development of Tantra রচনায় আমাদের জানিয়েছেন, তন্ত্রের আদি উৎসকে পুরানাপ্রস্তর যুগের শেষ ধাপে (৪০,০০০ থেকে ১০,০০০ খ্রিস্টপূর্ব) চিহ্নিত করা যায়। তিনি সাহিত্যিক এবং প্রত্নতাত্ত্বিক সূত্রে তার মতামতকে প্রামাণিক প্রয়াস হিসেবে তুলে ধরেছেন।

আপনি বলতে চাচ্ছেন, তন্ত্রই বাংলার একদম আদি ইতিহাস। কিন্তু তাহলে এই ইতিহাস কোথায় আছে?

দ্রাবিড় সৈকত : এটি একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আমি যদি একটু বাজেভাবে বলি, আমাদের এখানে এমন গবেষকের দেখা পাইনি, এমন সহৃদয় মানুষেরও দেখা পাইনি, যারা একটু সংবেদনশীলতা নিয়ে গবেষণার কাজ করবে, যারা পশ্চিমা ও ধর্মীয় বিভ্রান্তি এবং সমস্ত প্রভাব একটু দূরে রেখে গবেষণা করে একদম মূল জায়গাটায় পৌঁছানোর চেষ্টা করবে। যার কারণে আমাদের ইতিহাস গ্রন্থগুলোতে একেবারেই এসব ইতিহাস স্থান পায়নি। যে-কয়েকজনের নাম আমি বলেছি, নীহাররঞ্জন রায়, দীনেশচন্দ্র সেন, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়— তাঁদের লেখায় অনেকটা ইঙ্গিত রয়েছে। সেই ইঙ্গিত ধরে আমরা পরবর্তী প্রজন্ম যদি একটু অগ্রসর হতাম, তাহলে অনেক আগেই আমরা এসব ইতিহাসের মুখোমুখি হতে পারতাম। একটি মজার ব্যাপার হলো, পশ্চিমে এখন তন্ত্র নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হচ্ছে। পৃথিবীর সব বড়ো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তন্ত্র নিয়ে বেশ ভালো গবেষণা হচ্ছে। কিন্তু সমস্যার জায়গাটা হচ্ছে, তারা যেহেতু এখানকার অরিজিন না, ফলে তারা অনেকটা দূরবর্তী মানুষের মতো ভাবে। এবং পশ্চিমা সংস্কৃতির সাথে আমাদের সংস্কৃতির মূল যে-তফাত, সেটা হলো ভোগবাদী সংস্কৃতি আর ত্যাগবাদী সংস্কৃতি। ওরা যেহেতু ভোগের সংস্কৃতির, ওরা তান্ত্রিক যৌনতার দিকটাকে খুব হাইলাইট করেছে। মৈথুনকর্মে ইজাকুলেশনের টাইমটুকু যতোটা দীর্ঘায়িত করা যায়, এটা তাদের খুব ভালো লাগে। ফলে তন্ত্র আরেক দফা বিকৃত হচ্ছে, তন্ত্রের মূল জায়গাটা বেরিয়ে আসছে না। তন্ত্রের মূল জায়গায় আমাদেরকে আরো বেশি মনোযোগ দিতে হবে। তখন খুব বিস্তারিত পাওয়া যাবে তন্ত্রকে।
আমি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি, বাঙালি সংস্কৃতি অবশ্যই তান্ত্রিক সংস্কৃতি। তান্ত্রিক সংস্কৃতির বাইরে বাঙালির কিচ্ছু নেই। যা আছে, সব আরোপিত। আমাদের পণ্ডিতদের বিভিন্ন বিষয়ে একমত হতে না পারার কারণে এসব ইউরোপীয় শিক্ষা এবং ধর্মীয় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। বাঙালির ইতিহাসের যতো গ্রন্থ আছে, সবগুলো মিলিয়ে আপনি চার-পাঁচটি পৃষ্ঠা রেখে দিতে পারবেন। বাকি সব নষ্ট; অপচয়। বাঙালি সংস্কৃতিকে নষ্ট করার পেছনে, বাঙালি শব্দটিকে একটি গালিতে পরিণত করার পেছনে আমাদের গবেষকদের অবদান অনেক।

এ জাতীয় সংবাদ

তারকা বিনোদন ২ গীতাঞ্জলী মিশ্র

বাংলা দেশের পাখী

বাংগালী জীবন ও মূল ধারার সংস্কৃতি

আসছে কিছু দেখতে থাকুন

© All rights reserved © 2021 muktokotha
Customized BY KINE IT