1. muktokotha@gmail.com : Harunur Rashid : Harunur Rashid
  2. isaque@hotmail.co.uk : Harun :
  3. harunurrashid@hotmail.com : Muktokotha :
সৌদিদের অব্যবস্থাপনাই দায়ী ছিল - মুক্তকথা
বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ০৮:৫৬ পূর্বাহ্ন

সৌদিদের অব্যবস্থাপনাই দায়ী ছিল

সংবাদদাতা
  • প্রকাশকাল : বুধবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৬
  • ৩২২ পড়া হয়েছে

২০১৫ সালের ভয়ঙ্কর সেই ২৪ সেপ্টেম্বর, শত শত, হাজারও হতে পারে, হাজী মারা গেলেন মক্কায়
একজন রশীদ সিদ্দিকী দৈবভাবে বেঁচে গেলেন, এ তারই সেদিনের গল্প

[নিউইয়র্ক টাইমস এ লিখেছিলেন সারাহ আল মোক্তার ও ডেরেক ওয়াটকিনস]

অনুবাদ: হারুনূর রশীদ

হাজীগন কাবা চক্কর দিচ্ছেন। ছবিটি ২০১৪ সালের।

লন্ডন: বুধবার, ১২ই পৌষ ১৪২৩।। “আমি মরে যাচ্ছি। আমি মরে যাচ্ছি। একটু পানি চাই।”

বাঁচার জন্য একজন তীর্থযাত্রীর আর্থ চাৎকার। সূর্য্যতাপের মাত্রা তখন ১১৮ডিগ্রী। গায়ে ছেঁকা দেয়ার মত তপ্ত সৌদির মাটি। লোহার মত তপ্ত সেই মাটিতে পরেই কাতরাচ্ছিলেন ওই তীর্থযাত্রী ভাইটি। রশীদ সিদ্দিকী ওই তীর্থযাত্রীর কন্ঠ থেকে ভেসে আসা আওয়াজ স্পষ্টই শুনতে পাচ্ছিলেন। তীর্থযাত্রী ওই মানুষটি মাটিতে পড়েগিয়ে পদাঘাতে পদাঘাতে রক্তাক্ত হয়ে কাতরাচ্ছিলেন। উদোম গাঁয়ে, খালি পা, হতবুদ্ধী সিদ্দিকী কোনভাবে সেই বিভৎস অবস্থা থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন।

এ ছিল ২০১৫ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বরের ঘটনা। মক্কায়, বিশ্বের লক্ষকোটি মুসলমানের বছরে ৫দিন হজ্জ্বের তৃতীয় সকাল। বিভিন্নজনের মতে, এ দিনটি ছিল মুসলমানদের হজ্জ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর জীবননাশী দিন এবং বিশ্বের বিগত দশকের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দূর্ঘটনা।

আটলান্টার মেরিয়েত্তা থেকে হজ্জ্বের জন্য গিয়েছিলেন ৪২ বছরের আমেরিকান সিদ্দিকী। তিনি হাটছিলেন এলোমেলোভাবে টাঙ্গিয়ে রাখা তীর্থার্থীদের হাজার হাজার তাবুর ফাঁক দিয়ে। তার ঠিকানা ছিল ‘জমরত’ সেতু, যেখানে তীর্থযাত্রীরা রূপকার্থে তিন শয়তানকে পাথর মারেন।

রশীদ সিদ্দিকী তার আমেরিকার বাড়ীতে।

মানুষের ঢলের নিচে পড়ে মানুষ মরার পৈশাচিক ওই দৃশ্যপট থেকে তিনি তখন মাইলখানেক দূরে ছিলেন। শত শত তো অবশ্যই হবে হাজারও মানুষ সেদিন মারা গিয়েছিল। কিন্তু এক বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে আজও সৌদি কর্তৃপক্ষ কোন ব্যাখ্যা দেননি কিকরে এই ভয়ঙ্কর দূর্ঘটনাটি ঘটেছিল। এমনকি কত মানুষ সেদিন মারা গিয়েছিল তারও কোন সর্বজনগ্রাহ্য সঠিক হিসাব আজও তারা দেন নি। সৌদিদের ঘোর শত্রু ইরাণিরা প্রতিবছরই দুনিয়ার মুসলমানের মত মক্কায় এসে হজ্জ্বব্রত পালন করেন। এবারও বহু ইরাণি তীর্থযাত্রী এসেছিল। এই দূর্ঘটনা আর সৌদি সরকারের নিরবতা সৌদি-ইরাণ শত্রুতার নতুন খোরাক হয়েছে। ইরাণ সরকার ইতিমধ্যেই এবছর হজ্জ্বে যাবার উপর তাদের নাগরীকদের উপর নিষেধাজ্ঞা জানিয়ে দিয়েছে।

উপচে পড়া মানুষের ভিড় যখন হুমড়ি খেয়ে পড়ে হজ্জ্বকে তখন বিবর্ণ করে দেয়। এই ‘জমরাত’ সেতুর কাছে ২০০৬ সালেও একবার মানুষের ঢলে মানুষ বেসামাল হয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে ৩৬০ জন মারা গিয়েছিল। তখন সৌদি কর্তৃপক্ষ সেতুটি প্রশস্ত করার তাগিদ অনুভব করেছিল। সেতুটি প্রশস্ত করার পর আজ অবদি ওখানে কোন দূর্ঘটনা ঘটার খবর পাওয়া যায়নি।

বিশ্বের ৩৬টি দেশের সরকারী ভাষ্য ও জাতীয় সংবাদ মাধ্যমের হিসাব থেকে “এসোসিয়েটেড প্রেস” এর এক জরিপে দেখা গেছে মক্কার ওই দূর্ঘটনায় কমপক্ষে ২,৪০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। অথচ সৌদি সরকার এখনও ৭৬৯ জনের প্রাণহানীর একটি হিসাব দিয়ে যাচ্ছেন।

হজ্জ্ব পরিচালনায় অব্যবস্থাপনার সুদীর্ঘ অভিযোগ থাকার পরও সৌদি রাজপরিবার, হজ্জ্ব পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় তাদের পারিবারিক অধিকারের বিষয়টি এখনও বড় করে দেখছেন।

শারিরীক ও অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম প্রত্যেক মুসলমান জীবনে একবার মক্কায় গিয়ে হজ্জ্ব পালনে নীতিগতভাবে অঙ্গিকারাবদ্ধ। সৌদি আরবে ইসলামের পবিত্র স্থানগুলোর তত্ত্বাবধানকারী হলেন বাদশাহ, এমন নীতিই শাসক সৌদি রাজপরিবার চালিয়ে আসছে। আর তাদের অধীনে চালু থাকা “হ্জ্জ্ব” যাত্রীদের সংখ্যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রায় ১০গুণ বেড়ে গিয়েছে।

দৈবভাবে রশীদ সিদ্দিকী বেঁচে গেলেন।

সাম্প্রতিক বছরে সারা বিশ্ব থেকে ২ থেকে ৩ মিলিয়ন মানুষ মক্কায় হজ্জ্বব্রত পালনে এসেছে। সৌদিরা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করছে ক্রমবর্ধমান “হজ্জ্ব” তীর্থযাত্রীদের আবাসন সমস্যা সমাধানের জন্য। কিন্তু যা কিছুই করা হচ্ছে তার সবটুকুই বিত্তবানদের জন্য। যারা রাতপিছু ২,৭০০ ডলার খরচ করতে পারবে হোটেল কামরা পছন্দের জন্য, তারা খুব বিলাসীভাবে কামরায় বসে কাবা’র মনোরম দৃশ্য দেখতে পারবে। দেখতে পাবে পবিত্র মক্কার কেন্দ্রে অবস্থিত “আল্লাহ’র ঘর” বলে খ্যাত “কাবাঘর”কে।  কিন্তু বিত্তবান হজ্জ্বযাত্রীদেরও হজ্জ্বের রীতি অনুসারে ‘মিনা’য় হজ্জ্বের কিছু সময় তাবুতে কাটাতে হয়। এ সময় “মিনা” তাবুর এক মহানগরীতে পরিণত হয়। এ সময় “মিনা”য় আসা হজ্জ্ব তীর্থীদের দুনিয়ার পরিচিত অঞ্চলে ভাগ হয়ে তাবুতে থাকতে হয়।

মিঃ সিদ্দিকী ভোরের একটু আগেই তাবুর ভেতরে জেগে উঠেন। তিনি বন্ধু-বান্ধবদের সাথে গল্পগোজবে আর চা খেতে খেতে একসময় মেঝেতে মাদুরের উপর ঘুমিয়ে পড়েন। তার পাশেই অন্য প্রান্তে কয়েক গন্ডায় মানুষ ঘুমিয়ে আছেন। মাঝখানে একটিমাত্র কেনভাসের পর্দাদিয়ে তাবু ভাগ করা আছে।

সময় যাই হয় না কেনো, মিঃ সিদ্দিকী বলেন তিনি নিজেকে খুব তরতাজা ও সুস্থ্য বোধ করছিলেন। দু’সপ্তাহ আগে তিনি সৌদির রাজধানী এই রিয়াদেই একজন “ইমারত তথ্য ব্যবস্থাপক” হিসেবে কাজ করছিলেন, কিন্তু তিনি সে কাজ ছেড়ে দিয়ে শেষপর্যন্ত সাব্যস্ত করেন যে এবার হ্জ্জ্ব করে নিবেন।

২৪শে সেপ্টেম্বর ২০১৫ সাল, কয়েক হাজার হাজী মারা গেলেন মক্কায়।

তিনি হজ্জ্বব্রতকে এতো ঝামেলামুক্ত আরামদায়ক ভাবতেই পারেননি- তার কাছে অনেকটাই ছুটি কাটানোর মত, অথচ অনেক নামীদামী হাজী তাকে বলেছিলেন যে মিনাযাত্রা, গরুর গাড়ীযোগে ভাঙ্গা রাস্তায় পাড়ি দেবার মত কঠোর এক অবস্থা।

পায়ে চটিজুতো আর গায়ে সাদা দু’টুকরো কাপড়ের পোষাক যা “ইহরাম” নামেই পরিচিত, তার সেই “ইহরাম” পড়ে তিনি হাত-মুখ ধুয়ে প্রার্থনা কাজ শেষ করে তাবুর অন্যান্য সহযাত্রীদের সাথে রুচিকর নাস্তা সেরে নিয়ে একটু আয়েশ করছিলেন।

আরো সকলের মত তিনি তার গলায় ঝুলিয়ে রেখেছিলেন তার পরিচয় পত্র এবং সঙ্গের দামী জিনিষপত্র যেমন তার সেলফোন ও স্মার্টফোন, টাকার ব্যাগ, কোমড়বন্ধের জেবে রেখেছিলেন। মনে মনে আছে আমেরিকায় ‘মেরিয়েত্তায়’ থাকা তার দুই সন্তান ও স্ত্রী’কে ফোন করবেন।

তখন সময় অনুমান সাড়ে ৬টা, সিদ্দিকী তার তাবু থেকে বের হয়ে আসলেন, তৈরী হয়ে নিলেন শত সহস্র বছর আগের সেই নবী মোহাম্মদের পদাঙ্ক অনুসরণ করবেন।

মিঃ সিদ্দিকী তার শালা আর শালার বউসহ কতেক বন্ধু-বান্ধবের সাথে হাটতে শুরু করলেন। হাটার মাঝে মাঝে থামছিলেন ছবি তোলার জন্য, যা ফেইচবুকে দেবেন বলে।

তিনি বিস্ময়ে অভিভুত হচ্ছিলেন সারাবিশ্বের বিভিন্ন রং ও বর্ণের মানুষের ভিড় দেখে। এসব মানুষ তাদের নিজ নিজ দেশের পতাকা বহন করছিল।

হঠাৎই হিক্কা উঠার মত মনে হল, রাস্তার পাহড়াদার তাদের নির্দিষ্ট পথ আটকিয়ে দিল, যার কারণ আজ অবদি পরিস্কার নয়। সিদ্দিকী বলেন, চারিদিকে তাকিয়ে দেখেন অনেক মানুষ একটি “ওভারপাশ” এর কাছ দিয়ে বিকল্প একটি রাস্তা ধরে যেতে শুরু করেছে। তারাও ওদের অনুসরণের সিদ্ধান্ত নিলেন।

মিঃ সিদ্দিকী তার স্ত্রী’কে ভিডিও ফোন করলেন মনের উৎফুল্লতা জানানোর জন্য। আটলান্টায় তখন মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে। তার স্ত্রী তখন “ইদুল আযহা” পালনের সকল প্রস্তুতি সেরে উঠেছেন মাত্র, রাত পোহালেই কোরবাণীর মাংসভোজন যা হজ্জ্ব শেষ হয়ে যাবার জানান দেয়।

ফোনে হজ্জ্বের দৃশ্য দেখে মেসার্স সিদ্দিকী বললেন, সাদা কাপড়ে আবৃত এক সাগর মানুষ দেখে তার চক্ষু বিস্ফারিত হয়ে গেছে। মিঃ সিদ্দিকী তখন ভিডিও ক্যামেরা তার শালার দিকে ঘুরালেন। ভাইকে তখন তার নির্দিষ্ট লক্ষ্যের প্রতি খুবই দৃড়সংকল্পিত দেখাচ্ছিল বলে মিসেস সিদ্দিকী বললেন এবং ক্যামেরা বন্ধ করলেন। তার ননদও ভাবীর প্রতি হাসলেন ও হাত নাড়িয়ে শুভেচ্ছা জানালেন।

এ ছিল তার ভাই ও ভাবীর সাথে সর্বশেষ কথোপকথন ও দেখা।

তাদের রাস্তা ছোট হয়ে আসছিল। সকলে এক লাইনে হাটতে আসায় মিঃ সিদ্দিকী বন্ধু-বান্ধব থেকে অনেক পেছনে পড়ে গেলেন, একজন অন্যজনের কাধে ধরে হাটছিলেন। তিনি নিজের উপর মানুষের চাপ বেড়ে যাচ্ছে বুঝতে পারছিলেন। বেশ কিছু সামনে, হাজীরা রাস্তার উভয় পাশের উঁচু তারের বেড়া টপকিয়ে আসতে চাইছিল। মনে হচ্ছিল তারা কি একটা ঘটনা থেকে পালাতে চাচ্ছে। এক মূহুর্ত তিনি চিন্তা করলেন সেই একই পথ তিনি ধরবেন কি-না কিন্তু তিনি সে সুযোগই পাননি।

তিনি ধাক্কা খেলেন, দু’তিন দফা মাটিতে পড়ে গিয়ে তার সঙ্গের সাথী সকলকে হারালেন। তার চতুর্দিকে যারা ছিল সকলেই উচ্চৈস্বরে ইশ্বরকে ডেকে শেষ প্রর্থনা করছিল।

হুড়মোড় করে মানুষের পড়ে যাওয়া দেখে মনে হচ্ছিল মানুষ, মানুষের একটি ঢেউয়ে ধরা পড়েছে।  আশ-পাশের শরীরগুলো সবদিক থেকে তার উপর চাপিয়ে যাচ্ছে। তিনি ভিড়ের তালে তালে চলছিলেন। এক ইঞ্চি পরিমান জায়গা খালি নেই।

মানব ভিড়ের ধাক্কা-ধাক্কি অনেক হাজীদের শরীরের কাপড়-চোপড় খুলে নেয়, তারের বেড়া ডিঙ্গিয়ে যাবার পথ খুঁজছিলেন  যারা তাদের উলঙ্গ করে নেয়।

মিঃ সিদ্দিকী বলেন, “এ সময় আমি খুব ভীত হয়ে পড়ি,”।  কেবলই তার পরিবার পরিজনের কথা মনে আসছিল।

হজ্জ্বের জন্য সৌদি আরবের বাহিরের মুসলমানদের হজ্জ্বে আসতে হয় সংগঠিত দলের সাথে ব্যক্তিগত ট্রাভেল এজেন্সি বা নিজ দেশের সরকার নিয়ন্ত্রিত জাতীয় দলের সাথে। এটি সৌদি হজ্জ্ব মন্ত্রণালয়ের নিয়ম।

তাদের রাস্তা আটকে দেয়ার কিছু আগে রশীদ সিদ্দিকী এই ছবিটি তুলেছিলেন।

যেহেতু মিঃ সিদ্দিকী একজন ভারতীয় বংশোদ্ভুত আমেরিকান এবং সৌদি আরবে থাকেন, ফলে তিনি রিয়াদের একটি এজেন্সির মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হন যারা ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশীদের হজ্জ্বের ব্যবস্থা করে থাকেন। তিনি রিয়াদ থেকে মক্কায় ভ্রমণ করেন তার ট্রাভেল এজেন্সির ভাড়া করা একটি বাসে। তিনি কাবায় তার তীর্থের কাজ শুরু করেন এবং মিনা, আরাফাত ও মুজদালিফায় যান, জমরাতে যাবার আগেই।

মিঃ সিদ্দিকীসহ অধিকাংশ তীর্থযাত্রী মিনা দিয়ে হাটা শুরু করেন ‘জামারাত’এ যাবার জন্য। সৌদি হজ্জ্ব মন্ত্রণালয় মিনার সকল তাবু নিজেদের ব্যবস্থাপনায় রাখেন এবং কে কোন জায়গা থেকে এসেছেন কোন তাবুতে থাকবেন তা তারাই নিয়ন্ত্রণ করেন। মিঃ সিদ্দিকীর তাবু স্থানীয় ও দক্ষিন এশীয়দের জন্য ঠিক করে রাখা এলাকায় ছিল, যা কি-না ‘জমরত’ সেতু থেকে প্রায় ২ মাইল দূরে ছিল।

৫১১ নং স্ট্রীট ধরে তার যাবার রাস্তা বন্ধ ছিল ফলে তার দল ৪০৬ নং স্ট্রীট ধরে আগাতে শুরু করে, যাহা ২০৪নং স্ট্রীটে পরিবর্তিত হয়ে যায়। দূর্ঘটনাটি সংগঠিত হয় স্ট্রীট নং ২০৪ ও ২২৩ এর সংযোগস্থলে।

সৌদি কর্তৃপক্ষ বলেন, দূর্ঘটনা তখনই ঘটে যখন দু’টি বড় হাজী দল একই স্থলে মিলিত হয়। দূর্ঘটনাস্থলের একটি ছবি পর্যালোচনায় দেখা যায় যে খুব সম্ভবতঃ চলমান মানবঢেউ ২০৪ স্ট্রীটের ১০০০ খানেক ফুট জায়গা নিয়ে বিস্তৃত ছিল।

মৃত হাজীদের লাশ রাস্তায় রাখা হয়েছে।

পেষণে বা প্রবলচাপে মানুষের এই পতনকে ‘আতঙ্কপীড়িত মানুষের ছত্রভঙ্গ হয়ে আকস্মিক ধাবন’ই মূল কারণ বলে বিবৃত হয়েছিল, কিন্তু প্রবলচাপে মানুষ পড়ে যেতে পারে কিন্তু দলিত-মথিত হবার কথা নয়। বিশাল চলমান মানুষের চাপের সময় সৃষ্ট মানুষের প্রবল প্রবাহের কাছে একজন ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণ অকার্যকর। মানব চাপের ঢেউ উপরের দিকে দোলা দেয়, মানুষকে মাটিতে ফেলে দেয়। কখনও কখনও ১০/১৫ ফুট দোলিয়ে নিয়ে যায়।

প্রবল চাপে মানবদলের পতনে মৃত্যুর মূল কারণ শ্বাসরোধ হয়ে যাওয়া। এ সময় মানুষ এমন মোচড়ে দাড়িয়ে থাকা অবস্থায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়ে। খুবই দৈবিকভাবে মিঃ সিদ্দিকী নিজেকে আবিষ্কার করেন দূর্ঘটনার অনেক পেছনে পড়ে আছেন।

তিনি তার চপ্পল, ইহরামের উপরভাগ এবং তার পরিচয় পত্র হারিয়েছেন তবে কোন জখন হননি। কাছাকাছি তাবুর হাজীরা মানুষের ভিড়ে পানির বোতল ছোঁড়ে দিচ্ছিলেন। বেঁচে যাওয়া আঘাতপ্রাপ্ত মানুষজন পানিখাওয়া ও শরীরে দেয়ার জন্য হাহাকার করছিলেন। কে একজন ‘হোজ পাইপ’ খোলে দিল। পানির ধারা রাস্তা গড়িয়ে যাচ্ছিল। মিঃ সিদ্দিকী তৃষ্ণায় হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিলেন, তার কাছেই আরো কয়েকজন কাতরাচ্ছিলেন। “তিনি বললেন, জানিনা আমি কিভাবে বেঁচে গিয়েছি।” দু ঘন্টা ধরে সিদ্দিকী দেখছিলেন, পুলিশ ধীরে ধীরে তার কাছে আসছিল। মৃত এবং সামান্য আঘাতপ্রাপ্তদের পেছনে রেখে তারা মারাত্মক জখমদের সহায়তা করছিল। অবশেষে একজন অফিসার যখন তার কাছে আসলো, তাকে হজ্জ্ব সম্পন্ন করতে বললো।

এই সেই রাস্তা যা ‘জমরত’সেতু পর্যন্ত গিয়েছে। রশীদ সিদ্দিকী এই রাস্তায় উঠার জন্য হাটছিলেন।

সিদ্দিকী কেঁদে উঠলেন, তিনি জানেন জমরত সেতুর কাছে আসতে তাকে কি-না সংগ্রাম করতে হয়েছে। এতো সংগ্রামের পর বহুমৃতদেহ ডিঙ্গিয়ে মাত্র কয়েক শ’ফুট জায়গা পাড়ি দিয়েছেন। তিনি হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিলেন, সড়কপাশের পায়ে হাটার রাস্তার গরমে তার পায়ের তলা পুড়ে গিয়েছিল। “তিনি বললেন, আমি একজন মৃত মানুষের মত হাটছিলাম।”

যখন তিনি জমরত সেতুর কাছে পৌছিলেন, এক মহিলা তাকে পাথর ও একখান ছাতা দিল। খুব সম্ভবতঃ তার বিধ্বস্ত আর অর্ধনগ্ন চেহারা দেখে ওই মহিলার একটু দয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা কোন কথা বলেনি। ভাবে বুঝা গেল যে মহিলা বুঝতে পেরেছে মিঃ সিদ্দিকীর এসবের প্রয়োজন আছে। সিদ্দিকী, বিনিময়ে একটা ধন্যবাদ পর্যন্ত দিতে পারেননি মহিলাকে। যাক, মিঃ সিদ্দিকী তার হজ্জ্বক্রিয়া সম্পন্ন করলেন, কতটি পাথর মেরেছেন তা আর বলতে পারেননি।

ইতিমধ্যে তিনি তার তাবুতে ফিরে এসেছেন। তিনি জানেন তার শ্যালক নিখোঁজ আছে। তিনি বার বার তাদের ফোন করছিলেন কিন্তু কোন সাড়া পাচ্ছিলেন না।

হজ্জ্ব শেষ হবার মধ্যবর্তী ৪ দিন তীব্র দাবদাহের মধ্যেও মিঃ সিদ্দিকী ঘন্টার পর ঘন্টা হাটলেন, হাসপাতাল আর আশপাশের ক্লিনিকগুলিতে গেলেন কিন্তু তাদের কোন খবরই পেলেন না।

সৌদি কর্তৃপক্ষ এমন কোন জায়গা ঠিক করে দিলেন না যেখানে গিয়ে মানুষ তাদের প্রিয়জনের কোন খোঁজ নিতে পারে। মিঃ সিদ্দিকী বহু ঝগড়া-ঝাটি করলেন বিভিন্ন জায়গায় খবর নিতে গিয়ে। তিনি ৯০ মিনিট হেটে একটি মর্গে গেলেন, তার কোন আত্মীয়-স্বজন কাউকে পান কি-না কিন্তু মর্গ পাহাড়াদার তাকে ঢুকতেই দিল না। সিদ্দিকী, আটলান্টায় তার ফেরৎ যাওয়া বাতিল করে দিলেন এবং হজ্জ্বের পর পরই তার শালিকার পরিবারের সাথে মিলে খুঁজতে লেগে গেলেন। প্রতিদিন তারা একই স্থানে বার বার খবর নিতে থাকলেন কিন্তু কিছুই পেলেন না।

দূর্ঘটনার প্রায় ১৫ মিনিট আগে সিদ্দিকী এই ছবিটি তুলেছিলেন।

সবকিছু মিলিয়ে তার পরিবারের প্রায় ২০জন মানুষ এই খোঁজাখুঁজিতে অংশ নিয়েছিল। তারা প্রতিটি নির্ভরযোগ্য জায়গায় জায়গায় খবর নিতে লাগলেন কিন্তু সবখানেই শুধু গুজব আর ভুলতথ্য ছাড়া আর কিছুই পাননি।

উদাহরণ স্বরূপ, যখন তারা শুনলেন, হারিয়ে যাওয়া ভারতীয়দের একটি তালিকা ভারতীয় কনসুলেটে পাওয়া যাচ্ছে তক্ষুনি তারা সেখানে গেলেন খোঁজ নিতে। কিন্তু তার শালা ও তার বৌ এর নাম ওই তালিকায় পাওয়া যায়নি। অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনও একইভাবে হতাশাগ্রস্থ হয়ে ফিরে যায়। পাকিস্তানের সৈয়দ শাহজাদ আজহার তার মা ও ভাইকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না। ৯ মাস লেগেছিল তার, আর ডিএনএ পরীক্ষা, তারপর তার মায়ের মৃত্যু নিশ্চিত জেনেছিলেন। কিন্তু মোস্তাফিজুর রহমান তার বোনকে হারিয়েছিলেন। তিনি বললেন যে সৌদি হাসপাতালের কর্মিগন খুবই সাহায্যপ্রিয়। তিনি বাংলাদেশ থেকে উড়াল জাহাজে মক্কায় পৌঁছে দু’সপ্তাহ পর তার বোনের লাশ সনাক্ত করেন।

ভয়াবহ ওই দূর্ঘটনার পর সৌদি আভ্যন্তরীন মন্ত্রনালয়ের মুখপাত্র মেজর জেনারেল মনসুর আল তুর্কি বলেছিলেন, অবস্থায় মনে হচ্ছে দু’দিক থেকে দু’টি বিশাল মানব মিছিল একই স্থল ২০৪ নং সড়কে মিলিত হওয়ার সময় এ দূর্ঘটনাটি ঘটে।

বিপুল সংখ্যক ইরাণী মারা গিয়েছিলেন। ইরাণ, সৌদি প্রশাসনকে দায়ী করে বলেছিল, সৌদিদের অব্যবস্থাপনা ও অপকর্মমূলক অবহেলাই ভয়াবহ এই দূর্ঘটনার জন্য দায়ী। ইরাণের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনী গত সেপ্টম্বরে বলেছিলেন, “উপদ্রুত মানুষদের সৌদিরাই খুন করেছে।”

ইন্দোনেশিয়া থেকেও বিপুল সংখ্যক মানুষ হজ্জ্বব্রত পালনে মক্কায় আসেন। ১৩০ জন ইন্দোনেশিয়ান মারা গিয়েছিলেন। ইন্দোনেশিয়া সরকারও হতাশা প্রকাশ করেছিল সৌদিদের ভয়াবহ এ দূর্ঘটনা মোকাবেলার আচরণ দেখে। ইন্দোনেশিয়া বলেছিল দূর্ঘটনা কবলিতদের কাছে কিংবা হাসপাতালে পৌছতে তাদের পূর্ণ সুযোগ দেয়া হয়নি।

সৌদিদের ঘনিষ্ট মিত্র এবং সৌদি সাহায্যের বড় গ্রহিতা পাকিস্তান বিপুল পরিমান পাকিস্তানী মৃতদের সংখ্যা কমিয়ে দেখায় এবং দেশের সংবাদ মাধ্যমকে হুশিয়ার করে দেয় সৌদি হজ্জ্ব ব্যবস্থাপনাকে সমালোচনা না করার।

প্রথমটি ১৩৫জন মৃতের সংখ্যা।  দ্বিতীয়টি ৩৩৪জন মৃতের,  তৃতীয়টি ৩৬৮জন,  চতুর্থ ৪৬৪জন এবং পঞ্চমটি ১১০৩জন মৃতের সংখ্যা নির্দেশ করে।

আমেরিকান পলিসি এডভোকেসি গ্রুপ “দি মুসলিম পাবলিক এফেয়ার্স কাউন্সিল” এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সৌদি স্বচ্ছতা ও একটি স্বাধীন তদন্তের দাবি করেছিল। হজ্জ্ব ব্যবস্থাপনা একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার উপর ছেড়ে দেয়ার জন্যও তারা দাবী তুলেছিল কিন্তু সৌদি সরকার তা প্রত্যাখ্যান করে।

গত জুনে সৌদি কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করে বললেন এবারের হজ্জ্বে, পালনার্থীদের প্রত্যেককে হাতে পড়ার ইলেক্ট্রনিক ব্রেসলেট দেয়া হবে তাদের পরিচিতি সহজতর করার জন্য। নতুন করে তারা পাথর মারার উপর বিধিনিষেধ দিয়ে বলে দিলেন কখন ‘জমরত’ এ গিয়ে হাজীদেরকে পাথর মারতে হবে। কিন্তু একটি তদন্তের বিষয় বেমালুম চেপে গেলেন। এতো ভয়াবহ দূর্ঘটনার বিষয়ে কোন তথ্য দেয়ারও প্রয়োজনবোধ করলেন না মন্ত্রনালয়।

ভ্রান্ত-পরিশ্রান্ত হয়ে দূর্ঘটনার প্রায় ১০দিন পর মিঃ সিদ্দিকী তার পরিবার পরিজনের সাথে মিলিত হবার জন্য রিয়াদে আসলেন। এর কিছু দিন পর, অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনদের খোঁজখবরে রেখে তিনি আটলান্টার উদ্দেশ্যে উড়োজাহাজে চড়লেন।

ভয়াবহ দূর্ঘটনার ১৫দিন পর তার ছোট ভাই জানালেন যে তার শ্যালক মারা গিয়েছেন এবং মিনার একটি মর্গে তার মৃতদেহ রয়েছে। এ খবরের আধ ঘন্টা পরেই তাকে মিনায় দাফন করা হয়।

আরও দু’সপ্তাহ পর, তার শ্যালকের স্ত্রীও মারা গেছেন নিশ্চিত জানলেন। সাক্ষী হিসেবে তার একটি ছবির সাথে মিলিয়ে দেখার কথা বলা হয়েছিল। ওই সময়ের মধ্যে তাকেও সৌদিরা দাফন করে নেয়।

মৃত মা-বাবা তাদের দু’টি নাবালক সন্তান রেখে মারা গেছেন যাদের এখন নিকটাত্মীয়রা ভারতে দেখাশুনা করছে।

ভয়াবহ এ দূর্ঘটনার পর সিদ্দিকী যা যা করেছিলেন তার আত্মীয়দের পাবার জন্য, তিনি নিজে নিজেকে প্রশ্ন করেছেন বার বার, এ প্রশ্নগুলো তার জীবনকে পাল্টিয়ে দিয়েছে। ঘরে ফিরে সিদ্দিকী খুব খবর করেছেন, খুব খোঁজ নিয়েছেন। কি ঘটে গেল, জীবনে! তিনি কি কি করেছিলেন সবকিছু মিলিয়ে তার অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেছেন।

পরিণামে, তিনি বললেন, কোন উত্তরের আশা তিনি ছেড়ে দিয়েছেন।

শেষ কথা, তিনি বললেন, আমি ওখানে ছিলাম। আমি দেখেছি কিন্তু “আমি তোমাকে বলতে পারি না হুবহু আসল কারণ।”

[নিউইয়র্ক টাইমস এ লিখেছিলেন সারাহ আল মোক্তার ও ডেরেক ওয়াটকিনস] অনুবাদ: হারুনূর রশীদ
তথ্য সূত্র: Mina tent organization from Umm Al-Qura University. Hajj management information from the Saudi Ministry of Hajj and Umrah website. Crowd crush dynamics based on “The Causes and Prevention of Crowd Disasters,” by John J. Fruin. Hajj history from “Guests of God: Pilgrimage and Politics in the Islamic World,” by Robert R. Bianchi, and “Hajj: Journey to the Heart of Islam,” edited by Venetia Porter.
Sheikha Aldosary contributed reporting. Top photo by The Associated Press.

এ জাতীয় সংবাদ

তারকা বিনোদন ২ গীতাঞ্জলী মিশ্র

বাংলা দেশের পাখী

বাংগালী জীবন ও মূল ধারার সংস্কৃতি

আসছে কিছু দেখতে থাকুন

© All rights reserved © 2021 muktokotha
Customized BY KINE IT