ঘরের ভেতরের কোন্দল থামাতে অন্য দেশের উঠোনে বারুদের চাষ।
জাতিসংঘ কি কেবলদর্শক হিসেবেই থেকে যাবে? |
|
কোন ঘোষণা না দিয়েই “পুরোদস্তুর যুদ্ধ” চলছে ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে! আমেরিকা ঘোষণা দিয়েই ইসরায়েলকে সাহায্য করছে। তথাকথিত এ ছায়া যুদ্ধে মানুষ কিন্তু মরছে, বাড়ী-ঘর ধ্বংস হচ্ছে, সর্বোপরি বিশ্বব্যাপী দৈনন্দিন জীবনযাত্রার নিত্যব্যবহার্য্য দ্রব্য সামগ্রীর দাম বেড়েই চলেছে। বিশ্বব্যাপী নিরীহ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা দূর্বিসহ হয়ে উঠছে। ধ্বংস হচ্ছে বিশ্বপরিবেশ। বিশ্ব পরিবেশের পরিবর্তন আর সাধরণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দূর্বসহ করে তোলার পেছনের মূল কারণ বর্তমানের এ হাইব্রিড যুদ্ধ। আর বিশ্বযুদ্ধবাজরা এ’কে ‘ছায়াযুদ্ধ’ বলে যুদ্ধ চালিয়েই যাচ্ছেন। মেনে নিলাম যুদ্ধেরও একটি পরিচয় থাকা দরকার। আর ‘ছায়াযুদ্ধ’ নাম দিয়ে এর প্রকাশ হলো এর কারিগরি বা আইনি অবস্থান। তবে ভাষার ও ওলট-পালটের জন্য মাঠের পরিস্থিতি কিন্তু একটুও বদলায়নি। যুদ্ধে যা হয়ে থাকে এ যুদ্ধেও তাই হচ্ছে এবং এটাই স্বাভাবিক। এ বিষয়ে কারও দ্বিমত আছে বলে মনে হয় না। এতোসব ব্যাখ্যা বিশ্লষণের পরে স্বাভাবিক কারণেই যে প্রশ্নটা বিবেকবান সকল মানুষের মনেই আসা স্বাভাবিক তা’হলো এ ছায়াযুদ্ধের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য কি? মানবাত্মা হত্যা আর বিশ্বব্যপী অর্থনৈতিক সংকট তৈরী করা!(?) এ পর্যায়ে এখানেই কথা তুলে রাখি যে এ ছায়াযুদ্ধের ফলে বিশ্ববাসীর যে অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে সে ক্ষতিপূরণ করবেটা কে? বিশ্বনেতারা বা তাদের আড্ডা ‘জাতিসংঘ’ কি এর কোন জবাব দেবে? আমার এ প্রশ্নটি অত্যন্ত গভীর ও মানবিক বলেই আমি মনে করি কিন্তু অনেকেরই হয়তো মনোপ্লুত হবে না! না হোক, গরুর পাছায় লোহার শিকের খোঁচা দিয়েও গরুকেতো আর আজে-বাজে খাওয়া থেকে বিরত রাখা যায় না। যখন আমরা সামরিক কৌশল বা ভূ-রাজনীতির কথা বলি, তখন অনেক সময় যুদ্ধের ভয়াবহ অমানবিক দিকটি আড়ালে পড়ে যায়। এই তথাকথিত “ছায়াযুদ্ধের” ফলাফল হিসেবে সাধারণ মানুষের জীবনহানি এবং বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক হাহাকারই প্রধান হয়ে দেখা দিয়েছে, এ অবস্থাকে কি শব্দ ব্যবহার করে বুঝাবেন? তবে রাষ্ট্রশক্তিগুলোর দৃষ্টিকোণ থেকে এ ছায়াযুদ্ধের কিছু নির্দিষ্ট অমানবিক উদ্দেশ্য থাকে, যা তারা সরাসরি স্বীকার করে না। আসুন এবার এ ছায়াযুদ্ধের মূল লক্ষ্যগুলো বিশ্লেষণ করা যাক: ছায়াযুদ্ধের পর্দার আড়ালের উদ্দেশ্যসমূহ ১. সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে নিজেদের স্বার্থ রক্ষাআমেরিকা এবং ইরান—উভয় দেশই জানে যে একটি সরাসরি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ মানেই নিজেদের ধ্বংস। তাই তারা সরাসরি একে অপরের ভূখণ্ডে হামলা না করে তৃতীয় কোনো দেশে (যেমন সিরিয়া, ইরাক বা ইয়েমেন) যুদ্ধ চালিয়ে যায়। এতে করে: • নিজেদের দেশের অবকাঠামো ঠিক থাকে। • নিজেদের নাগরিকদের সরাসরি যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে দূরে রাখা যায়। • অন্য দেশের মাটিতে যুদ্ধ করে নিজেদের অস্ত্র ও প্রভাব পরীক্ষা করা যায়। ২. আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার (Geopolitical Dominance)মধ্যপ্রাচ্য হলো বিশ্বের জ্বালানি এবং বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু। • আমেরিকার লক্ষ্য: মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি প্রবাহের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ রাখা পাশাপাশি তাদের মিত্রদের(যেমন ইসরায়েল ও সৌদি আরব) নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। • ইরানের লক্ষ্য: মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন প্রভাব সরিয়ে দেয়া এবং একটি ‘শায়িয়া ক্রিসেন্ট’ বা নিজেদের বলয় তৈরি করা। ৩. প্রতিপক্ষকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করা (War of Attrition)সরাসরি যুদ্ধে জয়ী হওয়া কঠিন, তাই দু’পক্ষই চায় একে অপরকে অর্থনৈতিকভাবে ক্লান্ত করে দিতে। • নিষেধাজ্ঞা: আমেরিকা ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তাদের অর্থনীতি ধ্বংস করতে চায় যাতে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ তৈরি হয়। • অস্থিতিশীলতা: ইরান তার প্রক্সি গ্রুপগুলোর মাধ্যমে লোহিত সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুটে অস্থিরতা তৈরি করে বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করে, যাতে আমেরিকা পিছু হটতে বাধ্য হয়। আমাদের উদ্বেগ “মানবাত্মা হত্যা ও অর্থনৈতিক সংকট” সৃষ্টিকে নিয়ে।আমার এ প্রশ্নটি কি এ ছায়াযুদ্ধের সবচেয়ে নিষ্ঠুর সত্য নয়? সাধারণ মানুষকে জানিয়ে দেয়ার জন্য নিচে কিছু তথ্য তুলে ধরে দেয়া হলো এবং মানুষকে জানিয়ে রাখার এমন কাজ উচিৎ ও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলেই মনে করি। • মানবিক বিপর্যয়: এ ছায়াযুদ্ধের কারণে সিরিয়া, ইয়েমেন বা গাজার মতো দেশগুলোর সাধারণ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। বড় শক্তিগুলো যখন দাবার ঘুঁটি চালে, তখন সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ধ্বংস হয় এবং শিশুরা প্রাণ হারায়। • অর্থনৈতিক সংকট: এটি কি ঠিক নয় যে, লোহিত সাগরে বা হরমুজ প্রণালীতে সামান্য অস্থিরতা তৈরি হলেই সারা বিশ্বে জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। এর ফলে বাংলাদেশ বা ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ, দু’টি দেশের জেদ বা স্বার্থের লড়াইয়ের মাশুল দিচ্ছে পুরো বিশ্ব। এবার আসল কথা আসা যাক: রাষ্ট্রগুলোর কাছে এটি “জাতীয় নিরাপত্তা” বা “কৌশলগত বিজয়” হলেও, মানবতার বিচারে এটি কেবলই ধ্বংস এবং দুর্ভোগের মহোৎসব। ক্ষমতার এ খেলায় সাধারণ মানুষের জীবন বা বিশ্ব অর্থনীতি কখনোই বড় শক্তিগুলোর অগ্রাধিকার তালিকায় থাকে না। এ নিষ্ঠুর বাস্তবতার মাঝে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর(যেমন জাতিসংঘ) কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখার কোন আলাপই আজো শ্রুত হয়নি! এর চেয়ে অবাক করা আর কি হতে পারে?? আমাদের জাতিসংঘ কি কেবল দর্শক হিসেবেই থেকে যাবে? শেষ কথা: অবস্থা দেখে এমন মনে করা অযৌক্তিক হবে না যে- “বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর শান্তি আসলে কোনো ঐশ্বরিক বা স্রষ্টার আশীর্বাদ নয়, কোনভাবেই দীর্ঘকালের কোন গণতান্ত্রিক অনুশীলনের ফসল নয় বরং এটি অন্য দেশের কান্নার বিনিময়ে কেনা একটি পণ্য। তারা তাদের ঘরের ভেতরের কোন্দল থামাতে অন্য দেশের উঠোনে বারুদের চাষ করে। এটিই বর্তমান বিশ্বের সবচাইতে বড় ‘ওপেন সিক্রেট’ বা প্রকাশ্য গোপনীয়তা।” |