1. muktokotha@gmail.com : Harunur Rashid : Harunur Rashid
  2. isaque@hotmail.co.uk : Harun :
  3. harunurrashid@hotmail.com : Muktokotha :
সড়ক দূর্ঘটনা, দায় ও প্রতিকার - মুক্তকথা
বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ১০:০৫ পূর্বাহ্ন

সড়ক দূর্ঘটনা, দায় ও প্রতিকার

তনিমা রশীদ
  • প্রকাশকাল : শুক্রবার, ৪ মার্চ, ২০২২
  • ১২১২ পড়া হয়েছে
তনিমা রশীদ

বিগত দিনগুলিতে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে অনেক তরুণ তরুণী। খবরের কাগজ খুললে দেশের একটা না একটা অঞ্চলের সড়ক দুর্ঘটনা খবর পাওয়া যায়। শুধু তরুণ-তরুণীরা নয় দূর্ঘটনার স্বীকার হচ্ছে প্রাপ্তবয়স্ক, বয়স্ক সকল বয়সের। কেউ হারাচ্ছেন সন্তান কেউ হারাচ্ছে মাতাপিতা আবার কেউবা পঙ্গু হয়ে ঘরে বসে রয়েছে।

বিগত বছরের ১২ই অক্টোবর দুপুরে মৌলভীবাজার-রাজনগর সড়কে মাইক্রোবাসের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী কলেজ ছাত্র রাজা আহমদ(২২) নিহত হয়, আহত হয় মোটরসাইকেল চালক আরও এক কলেজ ছাত্র সাববির আহমদ(২৪)। আহত সাব্বিরকে প্রথমে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে তাকে সিলেট মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে পাঠানো হয়। একই দিনে রাতে রাজনগর উপজেলার চাটুরা এলাকায় মৌলভীবাজার থেকে আসা সিএনজি অটোরিকশা ও রাজনগর থেকে আসা মোটরসাইকেল মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ২ জন গুরুতর আহত হন, তাদের সিলেট পাঠানো হয়। আর বাকি দুজনকে মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়।

এ সব দুর্ঘটনার প্রধান কারণ কী, কারা এসব দর্ঘটনার জন্য দায়ী। এসব দুর্ঘটনা এড়াতে কি কি উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হলো অতিরিক্ত গতি ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে অন্য গাড়ীকে পেছনে ফেলে সামনে যাওয়া(ওভারটেকিং)। একটি গাড়ি অসাবধানতার সাথে অতিরিক্ত গতিতে অন্য চলমান গাড়িকে পেছনে রেখে সামনে চলে যাবার চেষ্টায় দুর্ঘটনা ঘটায়। অতিরিক্ত গতিতে সামনের গাড়ীকে ডিঙ্গিয়ে যাবার চেষ্টায় গাড়ির চালক গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। আবার আজকাল তরুণেরা খুব কম বয়সে মোটরবাইক নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পরে। অল্প বয়সী দূরন্ত এই তরুণরা খালি রাস্তা পেলে সেখানে খুব দ্রুত গতিতে বিদ্যুৎচালিত দ্বিচক্রযান (মটর সাইকেল) চালায়। তারা ভাবে খালি রাস্তায় তীব্রগতিতে বিদ্যুৎচালিত দ্বিচক্রযান চালালে কোনো দুর্ঘটনা ঘটবে না কারণ, খালি রাস্তায় অন্য কোনো গাড়ির সাথে সংঘর্ষ হবে না। কিন্তু তারা এটা ভুলে যায় অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালালে আশে-পাশে অন্য গাড়ি না থাকলেও দ্রুত গতির কারণে গাড়ির চালক ফসকাতে পারে, এতে চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বড় দুর্ঘটনার সম্মুখে পড়ে। পাহাড়ি অঞ্চলে এ ধরনের দুর্ঘটনা খুব বেশি হয়। আঁকাবাকা পথ থাকার কারণে অপরদিক থেকে কোনো গাড়ি আসছে কি না বুঝা যায় না যার কারণে এখানে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে।

অতিরিক্ত বহন সড়ক দুর্ঘটনার আরো একটি কারণ। অতিরিক্ত বহন হলো ধারণক্ষমতার বেশি মালামাল নেয়া। দু’টাকা বেশি রুজগারের জন্য বাস চালকের মাত্রাধিক যাত্রী নেয়া, ট্রাক চালকেরাও টাকার লোভে বেশি মালামাল বহন করেন, যার কারণে গাড়ি নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটায়।

সড়ক দুর্ঘটনার আরো একটি কারণ হলো আইন অমান্য করা। আইন অমান্যের দায় যতটা গাড়ী চালকের ততোটাই পথচারীদেরও। জরিপে দেখা গেছে, ৯১ শতাংশ চালক ‘জেব্রা ক্রসিং’য়ে অবস্থানরত পথচারীদের অধিকার আমলেই নেয় না। পাশাপাশি ৮৪ভাগ পথচারী নিয়ম ভেঙে রাস্তা পার হয়। যার কারণে উভয়ই দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়। কোনো ধরনের দক্ষ প্রশিক্ষণ ছাড়া লাইসেন্স দিয়ে অদক্ষ চালককে গাড়ি দিয়ে রাস্তায় নামালে দুর্ঘটনা ঘটবেই। দুর্ঘটনা ঘটায় এমন চালকের মধ্যে বেশিরভাগ চালক অদক্ষ গাড়ি চালক তারা না ঠিকমতো গাড়ি চালাতে পারে, না কোনো ধরনের নিয়মকানুন জানে। তাদের লাইসেন্স দেওয়া হয় না; তারা জাল লাইসেন্স তৈরী করে নেয়। অনেকের লাইসেন্স ঠিক থাকলেও তাদের প্রশিক্ষণ ঠিকমতো দেওয়া হয় না। আবার অনেকে আছে যার লাইসেন্স বিহীন গাড়ি চালায়। লাইসেন্স বিহীন গাড়ি চালানো থেকে প্রশিক্ষণ বিহীন গাড়ি চালানো গুরুতর অপরাধ। প্রশিক্ষণ না নিলে গাড়ি চালানোর কায়দাকানুন শিখা যাবে না। যার কারণ সূত্রে দুর্ঘটনা ঘটে।

সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হলো অতিরিক্ত পরিশ্রম। এ দেশে যেকোনো সময় যেকোনো জায়গায় বাস পাওয়া যায়। তা সকাল ভোরে হউক বা দের রাত হউক। বাস চালকের ২৪ ঘন্টাই বাস চালান। দিনরাত ২৪ ঘন্টা দায়ীত্ব পালন করার জন্য তারা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। সারাক্ষণ ইঞ্জিনের পাশে বসে থাকা। ইঞ্জিনের গরম হাওয়া বাহিরে ও আসেপাশের কোলাহলের কারণে ড্রাইভারদের মেজাজ বিগড়ে যায়। তখন তারা গাড়ি খুবই বেখেয়ালি ভাবে চালায়। এতে তারা যাত্রী, পথচারী ও নিজেদেরকে বিপদে ফেলে। আবার অনেক অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে চালক ঘুমে ঢলে পরে দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়।

নেশাগ্রস্ত হয়ে গাড়ি চালানো সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণের মধ্যে একটা। রাতের অন্ধকারে নেশাগ্রস্ত চালকেরাই গাড়ি চালিয়ে তাকে। একেতো রাতের অন্ধকার তার উপর নেশায় থাকার কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। এ দুর্ঘটনা কমই পথচারীদের সঙ্গে ঘটে। এ দুর্ঘটনাতো বেশি চালকের সাথে ঘটে। নেশারঝোঁকে সে নিজেকে বিপদের মুখে ফেলে।
উপরে বর্ণিত সড়ক দুর্ঘটনার যে কারণগুলো উল্লেখ করা হয়েছে এর জন্য দায়ী জনগণকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় জনগণের সাথে সরকারেরও কিছু দায়-দায়িত্ব রয়েছে। অপ্রশস্ত রাস্তা, অযথেষ্ট রাস্তা, ভাঙ্গা রাস্তা, অকঠোর আইন ব্যবস্থা, দক্ষ প্রশিক্ষণের সুযোগ না করা ও জালিয়াতি লাইসেন্স প্রতিরোধে ব্যর্থ হওয়ার কারণ এই সড়ক দুর্ঘটনা।

ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম আরো অনেক বড় বড় শহরের রাস্তাগুলো অপ্রশস্ত। এই বড় বড় শহরের রাস্তাঘাট খুবই ব্যস্ত থাকে। অপ্রশস্ত রাস্তা থাকার কারণে এখানে গাড়ি চলাচলে অসুবিধা হয়। মহাসড়কে প্রায়ই এই কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। রাস্তা অপ্রশস্ত হওয়ার সাথে সাথে যতো জনসংখ্যা বাড়ছে, যতো গাড়ি নামছে তার তুলনায় রাস্তার সংখ্যা খুব কম। যদি বেশি সংখ্যক রাস্তা থাকতো তাহলে অপ্রশস্ত রাস্তা হলেও কোনো সমস্যা হতো না। রাস্তা কম প্রশস্ততাও কম কিন্তু দুর্ঘটনা ঠিকই বাড়ছে। আর ভাঙ্গা রাস্তা হলো দুর্ঘটনার একটি মূল কারণ। রাস্তা ভাঙ্গা হওয়ার কারণে টায়ার ফেটে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। এসব রাস্তা ঠিক করার সময় অনেক জায়গায় বেশি পিচ ঢালা হয়। ফলে ব্রেক করলেও গাড়ি পিছলে সামনের দিকে চলতে থাকে যার কারণে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা ঘটায়।

গাড়ি চালকের অপ্রশিক্ষণের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু প্রশিক্ষণ নেওয়ার মতো তেমন কোনো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নেই। খুবই অল্প পরিমাণের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। আবার যতগুলো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে সেখান থেকে দক্ষ প্রশিক্ষণ ছাড়া অনেকেই লাইসেন্স তৈরী করে নিয়েছে। কেউ কেউ আবার জাল লাইসেন্সও তৈরী করে নেয়৷ অকঠোর আইন ব্যবস্থার কারণে জাল লাইসেন্স তৈরী হচ্ছে। পুলিশ এসব জালিয়াতি ব্যবসয়ীদের আটক করলেও ঘুষের মাধ্যমে ছেড়েও দেয়। যার কারণ এসব ব্যবসা দিন দিন বাড়ছে। জালি লাইসেন্স তৈরী ব্যবসায়ীদের মতো আরো একপ্রকার অসাধু ব্যবসায়ী রয়েছে, যারা গাড়ির যন্ত্রপাতির দুই নাম্বারি ব্যবসা করে। বিদেশ থেকে আমদানি করে আনা গাড়ি গুলোতে দুই নম্বর যন্ত্রপাতি লাগানোর কারণেও অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে। ট্রাফিক আইনের ক্ষেত্রেও তেমনি ঘটে। ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীদের জন্যে কোনো কঠোর আইন ব্যবস্থা নেই।

যে কারণে দিন দিন সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েই চলছে। এসব দুর্ঘটনায় যেমন পরিবারের সদস্য হারায় তেমনি কেউ কেউ পঙ্গু হয়ে কাটাচ্ছে বাকিটা জীবন। প্রাণহারা বা পঙ্গু ব্যক্তি যদি ঐ পরিবারের একমাত্র কমর্ক্ষম ব্যক্তি হয়, তাহলে ঐ পরিবারের টির অবস্থা কী হয় তা সহজে অনুমান করা যায়। প্রকৃতপক্ষে সড়ক দুর্ঘটনা শুধু একটি পরিবারের আর্থিক ক্ষতি করে না এ দুর্ঘটনায় দেশেরও আর্থিক ক্ষতি হয়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাক্সিডেন্ট রিচার্চ ইনস্টিটিউটের এক গবেষনায় বলা হয়েছে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনা এবং এর প্রভাবপ সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক ক্ষতি বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এসব দুর্ঘটনার কারণে বছরে ২-৩ শতাংশ জিডিপি হারাচ্ছে দেশ। চলিত বছরের প্রথম নয় মাসপ সড়ক দুর্ঘটনায় ২৯ হাজার ৭৮০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানা যায়। কাজেই সড়ক দুর্ঘটনা দূর করতে হবে যেকোনো উপায়ে।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কঠোর আইনের প্রয়োগ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ চালক এবং চলাচল উপযোগী রাস্তা ও রাস্তায় চলাচল উপযোগী যানবাহনের অবশ্যই প্রয়োজন। তবে একইসঙ্গে জনগণকেও হতে হবে সচেতন।

অল্প বয়সী উত্তেজিত তরুণদের মোটরবাইক দেওয়ার আগে তার প্রশিক্ষণ দিতে হবে। গাড়ি গতি নিয়ন্ত্রণে রেখে চালাতে হবে। পাহাড়ি এলাকায় রাস্তায় রাস্তায় একপ্রকার আয়না লাগাতে হবে যাতে অন্যদিক থেকে কোনো গাড়ি আসছে কি না দেখা যায়। বাস বা অন্য কোনো যানবাহনে অতিরিক্ত যাত্রী উঠানো বন্ধ করাতে হবে। তেমনি ট্রাকে ওভারলোড মালামাল বহন করা বন্ধ করেত হবে। ড্রাইভারদের ডিউটির সময় কম করতে হবে। বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে গাড়ি চালাতে হবে। তার সাথে সাথে দক্ষ প্রশিক্ষিতদের দ্বারা গাড়ি চালাতে হবে। দক্ষ প্রশিক্ষণ ছাড়া কাউকে লাইসেন্স দেওয়া যাবে না। জালিয়াতি লাইসেন্স এর ব্যবসা বন্ধ করতে হবে। ট্রাফিক আইন কঠোর করতে হবে এবং তা মেনে নেওয়ার জন্য জনগনকে উৎসাহিত করতে হবে। রাস্তাঘাট প্রশস্ত করতে হবে। ভাঙ্গা রাস্তা গড়তে হবে।

তবে যতদিন সড়ক থাকবে ততদিন এমন দুর্ঘটনা থাকবে। তবুও মানুষকে চলতে হবে। প্রতিটি জীব বা প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হয়। আমাদেরও করতে হবে। কিন্ত নিশ্চয়ই পথের বলি হয়ে কেউই মরতে চাই না। তাই আমাদের সচেতন হতে হবে। আমরা পথচারী, যানবাহন মালিক, যানবাহন চালক, হেলপার, যাত্রী বা ট্রাফিক পুলিশই হই না কেনো এমন দুর্ঘটনায় কে একজন দায়ী নয় দায়ী অনেকেই। তাই আমাদেরই সচেতন হতে। সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি যতই কঠিন হউক না কেন একটু সচেতনতার মাধ্যমে তা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।

এ জাতীয় সংবাদ

তারকা বিনোদন ২ গীতাঞ্জলী মিশ্র

বাংলা দেশের পাখী

বাংগালী জীবন ও মূল ধারার সংস্কৃতি

আসছে কিছু দেখতে থাকুন

© All rights reserved © 2021 muktokotha
Customized BY KINE IT