1. muktokotha@gmail.com : Harunur Rashid : Harunur Rashid
  2. isaque@hotmail.co.uk : Harun :
  3. harunurrashid@hotmail.com : Muktokotha :
কিছু মৃত্যু শব্দ ছড়ায় না - মুক্তকথা
সোমবার, ০৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:০৫ পূর্বাহ্ন

কিছু মৃত্যু শব্দ ছড়ায় না

শাহাবুদ্দীন বাচ্চুর ফেইচবুক থেকে
  • প্রকাশকাল : শনিবার, ৩ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ২০ পড়া হয়েছে

 

কিছু মৃত্যু শব্দ ছড়ায় না,
কেবল বিচারহীনতার ইতিহাস লিখে যায়

শাহাবুদ্দীন বাচ্চু

মৃত্যু সব জায়গায় সমান নয়। কেউ ইতিহাসে ওঠে, স্মৃতির আলোয় স্থির হয়ে যায় । কেউ হারিয়ে যায় নীরবতার অন্ধকারে, যেখানে শব্দও পৌঁছাতে পারে না। আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র, ইতিহাস সবই বেছে নেয় কার মৃত্যু বর্ণিত হবে আর কার মৃত্যু অদৃশ্য রাখা হবে।
দীপু রঞ্জন দাশ এবং ওসমান হাদী আমাদের সময়ের দুই বিপরীত মেরুর প্রতিচ্ছবি। এই দুটি নাম এখন আর কেবল দুটি বিয়োগান্তক ট্র্যাজেডির নায়ক নয় বরং তারা আমাদের পচে যাওয়া সমাজ ও রাষ্ট্রের সামনে টানিয়ে রাখা এক নির্মম আয়না। সেই আয়নায় তাকালে দেখা যায় আমরা কতটা সচেতনভাবে মৃত্যু বাছাই করি, কতটা নির্লজ্জভাবে শোকের বিভাজন করি আর শেষ বিচারে মানুষের প্রাণের চেয়ে তার পরিচয়কে কতটা বড় করে দেখি।

ওসমান হাদীর মৃত্যু ছিল পেশাদার খুনিদের লক্ষ্যভেদী সীসায় । এটি এক অব্যর্থ রাজনৈতিক বিনাশ। ক্ষমতার অন্দরমহলের দ্বন্দ্ব কিংবা নির্বাচনকে সামনে রেখে এক সুপরিকল্পিত অস্থিরতার বলি তিনি। তার রক্ত রাজপথে পড়ার আগেই রাষ্ট্রযন্ত্র সক্রিয় হয়েছে। বিবৃতি এসেছে, তদন্তের তপ্ত আশ্বাস মিলেছে এবং ঘটা করে হয়েছে শেষকৃত্য। রাষ্ট্র এখানে কথা বলে । রাষ্ট্র এখানে বিচার দিতে চায়।

কিন্তু দীপু রঞ্জন দাশ? তিনি কোনো রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি ছিলেন না। তিনি ছিলেন চাকা ঘুরানো এক নিভৃতচারী গার্মেন্টস শ্রমিক। একজন হিন্দু সংখ্যালঘু। তাকে হত্যা করা হয়েছে আদিম উল্লাসে। পরজীবনে অবিরাম আয়েশ নিশ্চিত করার জন্য ধর্মকে ঢাল বানিয়ে, গুজব ছড়িয়ে একদল মব কর্মী তাকে পশুর মতো পিটিয়ে, গাছে ঝুলিয়ে জীবন্ত পুড়িয়ে মেরেছে। অথচ রাষ্ট্র এখানে নীরব পাথর। কোনো সরকারি শোকবার্তা নেই, কোনো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের প্রতিশ্রুতি নেই। যেন এটাই হওয়ার কথা ছিল । একটি জ্বলন্ত লাশ হয়ে যাওয়াই ছিল দীপুর নিয়তি।

মানবাধিকার রিপোর্টগুলোর দিকে তাকালে এই বৈষম্যের চিত্রটি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, বাংলাদেশে ‘মব ভায়োলেন্স’ বা গণপিটুনি এখন এক সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে যখন ভুক্তভোগী দীপুর মতো কোনো প্রান্তিক সংখ্যালঘু হয়, তখন বিচার পাওয়ার হার নেমে আসে শূন্যের কোঠায়।

পরিসংখ্যান বলছে:
• সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর মাত্র ৩-৫ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রকৃত দোষীরা শাস্তি পায়।
• বাকি ৯৫ শতাংশ মামলার ফাইল ধুলোবালি আর লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে হারিয়ে যায়।
• রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে রাষ্ট্র যতটা ক্ষীপ্র, একজন সাধারণ শ্রমিকের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ততটাই পক্ষাঘাতগ্রস্ত।

পরিচয় প্রাণের চেয়েও দামী তাই মহামতি
কার্ল মার্কস লিখেছিলেন, “প্রত্যেক যুগে শাসক শ্রেণীর চিন্তাই হয়ে ওঠে শাসিত সমাজের চিন্তা।” আমাদের সমাজ আজ সেই বিষাক্ত চিন্তায় আচ্ছন্ন। আমরা শিখে গেছি, হাদীর একটি রাজনৈতিক পরিচয় ছিল, তিনি ক্ষমতার বলয়ের অংশ ছিলেন। তাই তার মৃত্যুতে আমরা কেঁপে উঠতেই হবে ।

আর দীপু? তিনি ছিলেন উৎপাদনের যন্ত্রের এক নগণ্য স্ক্রু। তার ওপর ছিল ধর্মীয় পরিচয়ের বোঝা। যখন দারিদ্র্য আর সংখ্যালঘুত্ব একই শরীরে ঘর বাঁধে তখন সেই মানুষের আর্তনাদ সমাজের কানে পৌঁছায় না।

আমরা অনেক সময় বলি সাম্প্রদায়িকতা বাড়ছে। কিন্তু বলি না কেন বাড়ছে? কারণ সাম্প্রদায়িকতা হলো শোষণের সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র। যখন ধর্মকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে দিয়ে সাধারণ মানুষকে হত্যা করানো যায় তখন ওপরতলার ক্ষমতা নিরাপদ থাকে। দীপুকে পুড়িয়ে মারার আড়ালে যারা ছায়া হিসেবে থাকে, দিনশেষে তারাই দেশান্তরিদের ভিটেমাটি আর দখল করা সম্পদের হিসাব মেলায়।

১৯৭১ সালে আমরা একটি অঙ্গীকার করেছিলাম । একটি অসাম্প্রদায়িক, সাম্যের দেশ গড়ার। সেই দেশের মাটিতে আজ একজন মানুষকে প্রকাশ্যে পুড়িয়ে মারা হয় আর আমরা নির্লিপ্তভাবে খবরের কাগজে চোখ বুলাই। এটি কেবল রাষ্ট্রের ব্যর্থতা নয় । এটি আমাদের সম্মিলিত বিবেকের পচন।

দীপু ও হাদীর মৃত্যু আমাদের সামনে এক রূঢ় সত্য রেখে গেছে । এই দেশে সবার জীবন সমান নয়। কেউ মরলে ক্ষমতার মসনদ নড়ে ওঠে, আর কেউ মরলে কেবল ধোঁয়ার কুন্ডলী বাতাসে মিলিয়ে যায়। এই বৈষম্যকে যদি আমরা স্বাভাবিক বলে মেনে নিই তবে আগামীর দীপুদের জন্য আর আগুনের প্রয়োজন হবে না । আমাদের এই ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর নিরবতাই তাদের পুড়িয়ে মারার জন্য হবে যথেষ্ট।

প্রশ্নটি আজ খুব সাধারণ কিন্তু অমোঘ, আমরা কি এমন এক সমাজ মেনে নেব যেখানে মানুষের প্রাণের দাম নির্ধারিত হবে তার নামে, ধর্মে আর পরিচয়ে? ইতিহাসের আদালত এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়াদের কখনো ক্ষমা করবে না। কখনোই না।

(এই আর্তনাদ কেবল রাষ্ট্রের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে নয় বরং আমাদের সেই নীরবতার বিরুদ্ধেও যা প্রতিদিন একজন মানুষকে তার পরিচয়ের খাঁচায় বন্দি করে হত্যা করছে। রাষ্ট্র নড়ে চড়ে বসে ক্ষমতার সমীকরণে কিন্তু সমাজ কেন পাথর হয়ে থাকে লাশের পরিচয়ের বিচারে?)(ফেইচবুক থেকে)

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় সংবাদ

তারকা বিনোদন ২ গীতাঞ্জলী মিশ্র

বাংলা দেশের পাখী

বাংগালী জীবন ও মূল ধারার সংস্কৃতি

আসছে কিছু দেখতে থাকুন

© All rights reserved © 2021 muktokotha
Customized BY KINE IT