হারুনূর রশীদ।।
লন্ডন: শনিবার, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩।। আজ ১০ ডিসেম্বর, ইন্টারনেটের পাতা উল্টাতেই পাওয়া গেল “এপল নিউজ”এ টুইটার অবলম্বনে “washington post”এর প্রবন্ধ। লিখেছেন একজন কেইটলিন গিবসন গত ৬ ডিসেম্বরে। যাকে নিয়ে লিখেছেন সে, ৭ বছর বয়সের এক সিরিয়ান শিশু, নাম ‘বানা আল আবেদ’। বানা আবেদ থাকে পূর্ব আলেপ্প শহরে। ওর মা ‘ফাতেমা’ শিশুটির নামে টুইটার একাউন্ট খুলে সারা বিশ্বের কাছে তাদের বাঁচাবার জন্য বিভিন্নভাবে লিখছেন। লিখে যাচ্ছেন। বানা’র টুইটারে তার মা ফাতেমা লিখেছেন- “আমরা নিশ্চিত, সশস্ত্র বাহিনী এখুনি আমাদের দখল নিতেছে। অন্য একদিন দেখা হবে হে বিশ্ব, বিদায়।” তার ওই ‘টুইট’ ‘রিটুইট’ হয়েছে ১৭২৫ দফা। তার কথাগুলো ভাল পেয়েছে সারা বিশ্বের ২,৪৩৫জন মানুষ আর তারা মা-মেয়ের ‘টুইট’ এর পাঠক মোট ২৩৩৮৪৯জন।
আমি বানা আর তার মা ফাতিমা’র ওই ‘টুইট’ হিসাবের অনেকগুলো ‘টুইট’ পড়ে বুঝতে পারলাম তারা ISIS দখলিত আলেপ্প শহরের পূর্বদিকে যাকে তারাই পূর্ব আলেপ্প বলে উল্লেখ করেছে, সেখানে থাকেন। তাদের ভাষায় স্পষ্টতঃই বুঝা যায় তারা ISIS এর দখলদারিত্বের সময় কোন ভাবে বেঁচেবর্তে ছিলেন। এখন আসাদ সরকারের সামরিক বাহিনী তথা রুশিয়া সমর্থিত সিরিয়া বাহিনী যেভাবে বোমা মারছে পূণর্দখলের জন্য এতে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। এ ভয় তাদের নিশ্চয়ই এ কারনেই যে ISIS যদ্দিন আলেপ্প’র দখলে ছিল তারা, যেভাবেই হোক, ভালই ছিলেন। সুখে ছিলেন!
এখন সিরিয় বাহিনী পুনঃদখল করে নিতে গিয়ে যে কামান দাগছে তাতে গোলার আঘাতে তাদের মৃত্যুও হতে পারে। তাদের বাড়ীঘর সব গেছে। বিধ্বস্ত বাড়ীর ছবিও তারা ‘টুইট’ করেছে। ‘ওয়াশিংটন পোষ্ট’ খুব সম্ভবতঃ তাদের পাঠক সংখ্যা দেখে বিশ্ব জনমতের কথা মাথায় রেখে বিষয়টি নিয়ে সংবাদ ছেপেছেন। বিষয়টি মনে দাগ কাটে ঠিকই! জানিনা এই মূহুর্তে ফাতেমা আর তার ৭ বছরের কন্যা বানাআবেদ বেঁচে আছে কি-না!
এ খবরেরই গোড়া খুঁজতে গিয়ে পেয়ে গেলাম, দামেস্ক থেকে প্রকাশিত AMN নামের একটি ওয়েবসাইট। পড়ে বুঝতে পারলাম AMN সিরিয় সরকার সমর্থিত একটি ওয়েব সাইট।

সিরিয় বাহিনী আলেপ্পোর একটি অংশে বিশাল এই অস্ত্রের ডিপো পেয়েছে। কে বা কারা ISISকে এই অস্ত্র গোলাবারুদ দিলেন? দুনিয়ার মানুষ জানতে পারবে কি?
সেখানে ২০টি ‘ব্রেকিংনিউজ’ এর মাঝে ১১টিই ছিল সিরিয়াকে নিয়ে এবং সবই শুধু যুদ্ধ আর মানুষ হত্যা নিয়ে। তুর্কির বোমায় ১২ নিহত দিয়ে শুরু করে, সিরিয়া বাহিনী অস্ত্র ডিপো খুঁজে পেয়েছে’র ছবি, হোমস প্রদেশে আইএসআইএস নিশ্তেজ হয়ে আসছে, সিরিয়ান সশস্ত্র বাহিনী চিরুনী অভিযান চালিয়েছে, কেনাডার শান্তি প্রস্তাবকে প্রত্যখ্যান করে জাতিসংঘে সিরিয়ার প্রতিনিধি জাফরী বলেছেন-“সব খেলার শেষ হয়ে গেছে”, সিরিয়ার মহিলা বেটেলিয়ান এখন সন্মুখ সমরে ইত্যাদি। এ থেকে সহজেই সিরিয়ার যুদ্ধাবস্তার একটি ভয়াবহ চিত্র পাওয়া যায়।
এখানে আমাদের শুধু মাত্র একটি প্রশ্ন। দুই বৃহৎ শক্তি রুশ-আমেরিকা বিগত দিনে- মতবাদ, রাজনীতি, দখল ও তার জন্য যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা করে, দীর্ঘ আঠারো বছর ভিয়েৎনামে নরহত্যা যজ্ঞ চালিয়েছিল। জাতিসংঘ সহ দুনিয়ার কেউ তার কোন বিচার করেছিল তা আজও শুনিনি। মতবাদের নামে পরিকল্পিতভাবে কোটি মানুষ হত্যা করার পরও কোন দেশকে বিচারের সন্মুখীন হতে হয়নি। এই পার পেয়ে যাবার সাহসেই ওই দুই দুষ্ট শক্তি নতুন করে ইরাক-আফগানিস্তানের পর সিরিয়ায় শুরু করেছে তাদের যুদ্ধ ব্যবসা। তাদের এই যুদ্ধ ব্যবসা এখন দুনিয়ার মানুষের কাছে সূর্য্যের মত সত্য। কে না বুঝে তাদের এই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার স্বরূপ। কিন্তু “ওয়াশিংটন পোষ্ট” এর মত পত্রিকাও পারেন না শ্রেণী স্বার্থের উর্ধে উঠতে। মানবতার নাম নিয়ে তারাও লিখেন, কিন্তু লিখতে গিয়ে খুব কৌশলে দুই দুষ্ট শক্তির একটির পক্ষে লিখেন।
আমরা অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বুঝি যে সিরিয়ার এই যুদ্ধ ব্যবসা ঠিকই শেষ হবে; যেভাবে এখন অনেকটা স্তিমিত হয়ে এসেছে ইরাক-আফগানিস্তান যুদ্ধ। ওখানে চলছে এখন নির্মাণ ব্যবসা। আর ওই ব্যবসার রাস্তা বের করে দেবার জন্য কয়েক কোটি মানুষকে ঘরছাড়া হয়ে বিদেশের মাটিতে দাস জীবন অতিবাহিত করতে বাধ্য করা হয়েছে। কত লক্ষ প্রান দিয়েছে আসলে তা বলা মুষ্কিল! তথ্য বিশারদদের অনেক তথ্যই সাধারণ মানুষের বিশ্বস্ততা হারিয়েছে। ঠিক একই পথে সিরিয়ার যুদ্ধও নিষ্প্রভ হয়ে আসতেছে এবং একসময় শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু এই লক্ষ কোটি মানুষের আত্মাহুতির কোন বিচার কি প্রকাশ্যে হবে? যা, দুনিয়ার মানুষ জানতে পারবে? আমাদের আশা নেই!