বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণবন্ত উৎসব হলো বসন্ত উৎসব বা বসন্ত বরণ। এটি কেবল একটি ঋতু পরিবর্তন নয়, বরং বাঙালির মনন ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রবাসে বাঙ্গালীর বসন্ত এবার নিরবেই ফিরে গেলো!
বসন্ত উৎসব মূলত সারা বাংলায় (বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ) পালিত হয়। তবে কিছু নির্দিষ্ট জায়গা এই উৎসবের জন্য বিশ্বজুড়ে খ্যাত হয়ে উঠেছে। যেমন বলা যায়-
শান্তিনিকেতন (পশ্চিমবঙ্গ): কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বভারতীতে ‘বসন্তোৎসব’ শুরু করেছিলেন। এটিই সম্ভবত সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্র।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (বাংলাদেশ): ঢাকার চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় ‘বসন্ত বরণ’ উৎসবের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। এছাড়া রমনা পার্ক, ধানমন্ডি লেক এবং রবীন্দ্র সরোবরেও ব্যাপক আয়োজন থাকে।
অন্যান্য অঞ্চল: চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট এবং কোলকাতার রাজপথেও এই উৎসব সমান উদ্দীপনায় পালিত হয়।
বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী ফাল্গুন মাসের প্রথম দিন, অর্থাৎ পহেলা ফাল্গুন এই উৎসব পালন করা হয়।
গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এটি সাধারণত প্রতি বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি (আগে ১৩ ফেব্রুয়ারি ছিল, কিন্তু সংশোধিত বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী এখন ১৪ ফেব্রুয়ারি) পালিত হয়।
বসন্ত উৎসব পালনের ধরন অত্যন্ত নান্দনিক এবং বর্ণিল। এর প্রধান কিছু বৈশিষ্ট্য হলো:
পোশাকের বাহার: নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বাসন্তী(হলুদ), কমলা এবং লাল রঙের পোশাক পরেন। মেয়েরা খোপায় গাঁদা বা পলাশ ফুলের মালা জড়ান এবং মাথায় ফুলের ‘ক্রাউন’ পরেন।
গান ও নাচ: উৎসবের মূল সুর হলো রবীন্দ্রসঙ্গীত। “ওরে গৃহবাসী, খোল দ্বার খোল, লাগল যে দোল”—এই গানের মাধ্যমে উৎসবের সূচনা হয়। এছাড়া লোকজ গান ও নৃত্যের আয়োজনও হয়ে থাকে। শান্তিনিকেতন ও পশ্চিমবঙ্গে এটি ‘দোল পূর্ণিমা’ বা দোলযাত্রার সাথে মিশে যায়, যেখানে একে অপরকে আবির দিয়ে রাঙিয়ে দেয়। বাংলাদেশে মূলত ফুলের ব্যবহার বেশি।
• শোভাযাত্রা:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে বের করা হয় বর্ণাঢ্য ‘বসন্ত র্যালি’ বা শোভাযাত্রা। বাঙালির এই উৎসব আসলে রুক্ষ শীতের পর নতুন জীবনের জয়গান গাওয়ার এক মাধ্যম।
বসন্ত উৎসবের ইতিহাস বেশ প্রাচীন হলেও বর্তমানের যে ‘পহেলা ফাল্গুন’ বা ‘শান্তিনিকেতনি বসন্তোৎসব’, তার শুরুটা হয়েছে গত শতাব্দীর বিভিন্ন সময়ে। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষিত নিচে আলাদাভাবে দেওয়া হলো:-
১. বাংলাদেশ (ঢাকা কেন্দ্রিক উৎসব)
বাংলাদেশে বর্তমানে যে ঘটা করে পহেলা ফাল্গুন বা বসন্ত উৎসব পালিত হয়, তার প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা খুব বেশিদিনের নয়।
• বঙ্গাব্দ ১৪০১ (ইংরেজি ১৯৯৪ সাল): এই বছর থেকে বাংলাদেশে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জাতীয় বসন্ত উৎসব উদ্যাপন পরিষদ’-এর উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় বসন্ত উৎসব পালন শুরু হয়।
• তবে ১৯৯১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীরা সীমিত পরিসরে এই উৎসবের আয়োজন করেছিলেন, যা পরবর্তীতে ১৪০১ বঙ্গাব্দে সর্বজনীন রূপ পায়।
২. পশ্চিমবঙ্গ (শান্তিনিকেতন কেন্দ্রিক উৎসব)
পশ্চিমবঙ্গে বসন্ত উৎসবের আধুনিক ও সাংস্কৃতিক রূপটি দিয়েছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৩১৩ বঙ্গাব্দ (ইংরেজি ১৯০৭ সাল): রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট ছেলে শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে প্রথম ‘ঋতু-উৎসব’ (যা পরবর্তীকালে বসন্ত উৎসবে রূপ নেয়) শুরু করেছিলেন।
ইংরেজি ১৯২৩ সাল: এই বছর থেকে শান্তিনিকেতনে নিয়মিতভাবে বসন্ত পূর্ণিমার দিনে ‘বসন্তোৎসব’ পালনের রীতি চালু হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই উৎসবকে নাচ, গান এবং আবিরের মাধ্যমে একটি মার্জিত ও নান্দনিক রূপ দান করেন।
৩. প্রাচীন ইতিহাস ও মোগল আমল
উৎসবের শেকড় আরও গভীরে: মোগল আমল (১৫৮৫ খ্রিষ্টাব্দ): সম্রাট আকবর যখন বাংলা সন (ফসলি সন) প্রবর্তন করেন, তখন তিনি বছরজুড়ে ১৪টি উৎসব পালনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ‘বসন্ত উৎসব’। তখন এটি মূলত খাজনা আদায় এবং ঋতু পরিবর্তনের আনন্দ হিসেবে পালিত হতো।
• প্রাচীন যুগ: হিন্দু পৌরাণিক আমল থেকেই ‘মদনোৎসব’ বা ‘দোলযাত্রা’ হিসেবে বসন্তকালীন উৎসবের প্রচলন ছিল, যা মূলত ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে পালিত হতো।
সহজ কথায়: শান্তিনিকেতনে ১৯০৭ (বা ১৯২৩) সাল থেকে এবং বাংলাদেশে ১৪০১ বঙ্গাব্দ (১৯৯৪ সাল) থেকে বর্তমান ধারার বসন্ত উৎসব পালিত হয়ে আসছে।