–হারুনূর রশীদ
বাংলাদেশের বাস্তবতায় একটি সংলাপনির্ভর রাজনৈতিক পাঠ
ভূমিকা
বাংলাদেশে বামপন্থী রাজনীতি আজ বহুধাবিভক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে গৌরবময় ইতিহাস, আত্মত্যাগ ও আদর্শিক দৃঢ়তা; অন্যদিকে রয়েছে রাজনৈতিক প্রান্তিকতা, সাংগঠনিক স্থবিরতা এবং জনমানুষের সঙ্গে দূরত্ব এবং স্থান ও পাত্র ভেদে বিচ্ছিন্ন।
এ লেখাটি কোনো দলীয় ইশতেহার নয়, আবার নিছক বুদ্ধিবৃত্তিক সমালোচনাও নয়। এটি একটি তর্কধর্মী সংলাপ, যেখানে বামপন্থা নিজের মুখোমুখি দাঁড়ায়—শ্রমিক, তরুণ ও সমালোচকের চোখে।
১. বাংলাদেশে বামপন্থা কি অপ্রাসঙ্গিক?
“বামপন্থা কি আজ অপ্রয়োজনীয়”(?)
এ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ বাস্তবতা হলো—সংসদে বামদের উপস্থিতি ক্ষীণ, কখনও কখনও শূণ্যের কোঠায় ছিল। রাজপথে প্রভাব সীমিত, আর সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক কল্পনায় বামপন্থা প্রায় অনুপস্থিত।
কিন্তু প্রশ্নটা পাল্টে যায় যখন শ্রমজীবী কণ্ঠ উঠে আসে—
“আপনারা থাকুন বা না থাকুন,
আমাদের পাশে যে দাঁড়াবে—আমরা তার সঙ্গেই থাকবো।”
এখানেই বামপন্থার অস্তিত্বগত যুক্তি নিহিত।
২. তত্ত্ব বনাম জীবনের বাস্তবতা
বাম রাজনীতির বড় দুর্বলতা আজ তত্ত্ব নয়—তত্ত্বের ভাষা।
শ্রমিক জানে সে শোষিত,
কিন্তু সে জানতে চায়—
• আগামী মাসের ভাড়া
• চাকরি হারালে আইনি সুরক্ষা
• দুর্ঘটনায় মরলে সন্তানের ভবিষ্যৎ
শ্রেণিসংগ্রাম যদি এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর না দেয়, তবে তা স্লোগান হয়ে থাকে, রাজনীতি হয় না।
শেষে বলতে হয়-
আদর্শ বদলাতে হবে না, আদর্শের প্রয়োগ বদলাতে হবে।
৩. বিভাজনের রাজনীতি: আত্মঘাতী বাস্তবতা
একই কারখানায় একাধিক বাম ইউনিয়ন—এটি মতাদর্শের জয় নয়, বরং শ্রমিকের পরাজয়।
সংলাপের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ প্রশ্নটি আসে শ্রমিকের মুখ থেকেই—
“আমার মজুরি কম—
এটা কি লেনিনীয় না মাওবাদী সমস্যা?”
এ প্রশ্নের উত্তর না থাকলে বাম ঐক্যের দাবি নৈতিকতা হারায়।
এ অবস্থা থেকে শিক্ষা:
ন্যূনতম দাবিতে ঐক্য ছাড়া বামপন্থা কখনো গণশক্তি হতে পারে না।
![]() |
৪. নেতৃত্ব সংকট: অভিজ্ঞতা বনাম ভবিষ্যৎ
বাম রাজনীতিতে নেতৃত্বের বয়স বাড়ছে, কিন্তু নেতৃত্বের ভাষা তরুণদের ছুঁতে পারছে না।
তরুণেরা আজ—
• ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়
• তারা প্রশ্নকর্তা
• তারা আদর্শ গ্রহণে সমালোচনামুখর
তাদের শুধু কর্মী হিসেবে ব্যবহার করে, সিদ্ধান্ত থেকে দূরে রাখলে বামপন্থা একটি রাজনৈতিক জাদুঘরে পরিণত হবে।
“ভবিষ্যৎ ছাড়া অভিজ্ঞতা—
স্মৃতিচারণ, রাজনীতি নয়।”
৫. রাষ্ট্র নয়, সমাজকেন্দ্রিক রাজনীতি
বামপন্থা দীর্ঘদিন রাষ্ট্রক্ষমতার স্বপ্ন দেখেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—
সব লড়াই সংসদে হয় না।
আজ দরকার—
• স্থানীয় শ্রমিক সুরক্ষা
• শিক্ষা ও স্বাস্থ্য আন্দোলন
• আইনি সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তা
রাজনীতি যদি নির্বাচনের আগেই মানুষের জীবনে উপস্থিত না থাকে, নির্বাচন রাজনীতিকে ফিরিয়ে দেবে না।
৬. শেষ কথা: বাস্তব কর্মপরিকল্পনা
এই তর্কের ফলাফল কোনো আবেগী সিদ্ধান্ত নয়, বরং ৫টি বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ—
আইনি সহায়তা, জরুরি তহবিল ও সংগঠিত প্রতিরক্ষা কাঠামো।
৫ দফা শ্রমজীবী দাবি, এক কারখানায় এক ইউনিয়ন।
উপসংহার: বামপন্থা—ঐতিহ্য নয়, দায়িত্ব
বামপন্থা কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নয় যে বছরে একদিন ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হবে।
এটি একটি চলমান দায়িত্ব।
দায়িত্ব পালন না করলে,
ইতিহাস কোনো আদর্শকে ক্ষমা করে না।
জীবন ভিত্তিক দীর্ঘ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিজ্ঞতা থেকে আজকের এ আলোচনা ও প্রস্তাবনা
সহযোগীতায়-“রহিমুন্নেছা-ওয়াছিল-হেলেনা ফাউন্ডেশন” ও জেমিনি