| সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জনের কিছু বক্তব্য দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো, সংবিধানের পবিত্রতা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তিনি যে আইনি লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছেন, তা কেবল একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত অবস্থান নয়, বরং সচেতন নাগরিক সমাজের জন্য একটি বড় বারতা।
১. অস্বাভাবিক অধ্যাদেশ জারি: সংসদ বনাম নির্বাহী বিভাগ
অধ্যাপক কার্জন জানিয়েছেন, গত দেড় বছরে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন প্রণয়নের মূল কেন্দ্র হলো জাতীয় সংসদ। সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ অধিবেশন না থাকা অবস্থায় বিশেষ প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। কিন্তু মাত্র ১৮ মাসে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি হওয়া অত্যন্ত “অস্বাভাবিক”।
কেন এটি উদ্বেগের?
অজস্র অধ্যাদেশের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করলে জনগণের প্রতিনিধিদের (সংসদ সদস্য) মতামত উপেক্ষিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এটি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। অধ্যাপক কার্জন এই প্রক্রিয়ার আইনি বৈধতা যাচাইয়ের যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার একটি প্রচেষ্টা।
২. সার্বভৌমত্ব ও রহস্যময় বিদেশি চুক্তি
সংবিধানের ১৪৫(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিদেশের সাথে কোনো চুক্তি সম্পাদিত হলে তা জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অধ্যাপক কার্জন দাবি করেছেন যে, আমেরিকার সাথে কিছু অনৈতিক ও বেআইনি চুক্তি করা হয়েছে যা দেশের সার্বভৌমত্বকে সংকটে ফেলতে পারে।
রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার অজুহাতে যদি এমন কোনো চুক্তি করা হয় যা দেশের স্বার্থের পরিপন্থী, তবে তা আদালতের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করা প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। তিনি এই চুক্তিগুলোর বৈধতা নিয়ে রিট করার যে ঘোষণা দিয়েছেন, তা জাতীয় নিরাপত্তা ও জনস্বার্থ রক্ষার একটি সাহসী পদক্ষেপ।
৩. ইতিহাস ও স্মৃতি রক্ষা: বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ভাঙার প্রসঙ্গ
ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িটি কেবল একটি স্থাপনা নয়, এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জীবন্ত ইতিহাস। অধ্যাপক কার্জন এই বাড়িটি ভাঙার বা অবমাননার বিরুদ্ধেও মামলা করার ঘোষণা দিয়েছেন। যেকোনো সভ্য রাষ্ট্রে জাতীয় নেতাদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে সংরক্ষিত থাকে। আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে এই ইতিহাসকে সুরক্ষা দেওয়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের দায়বদ্ধতা।
৪. কেন এই লড়াই গুরুত্বপূর্ণ?
একজন আইন বিশেষজ্ঞ যখন নিজেই বাদী হয়ে আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন বোঝা যায় রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর ভেতরে বড় ধরনের কোনো বিচ্যুতি ঘটছে। তাঁর এই পদক্ষেপগুলো সফল হলে:
• রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের একচ্ছত্র ক্ষমতা ব্যবহারের ওপর আইনি লাগাম পড়বে।
• দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ক্ষেত্রে জনস্বার্থ ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব অগ্রাধিকার পাবে।
• জাতীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্য রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে থাকবে।
শেষে বলতে হয়,
সংবিধান কোনো স্থবির দলিল নয়, বরং এটি একটি জীবন্ত সত্তা যাকে রক্ষা করার দায়িত্ব প্রতিটি নাগরিকের। অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন যে প্রশ্নগুলো তুলেছেন, তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এই লড়াই কেবল আদালতের বারান্দায় সীমাবদ্ধ না থেকে সাধারণ মানুষের সচেতনতায় রূপ নেওয়া প্রয়োজন। |