| জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ও ভূ-রাজনীতি: সার্বভৌমত্ব রক্ষায় চাই ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি |
![]() |
| ২০২৪-এর জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, তার চূড়ান্ত প্রতিফলন ঘটেছে গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারের সামনে ভূ-রাজনৈতিক চাপ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে আমেরিকার সাথে প্রস্তাবিত একপাক্ষিক চুক্তিগুলো দেশের দীর্ঘমেয়াদী সার্বভৌমত্বের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। একটি গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়ার যে ম্যান্ডেট নিয়ে বর্তমান সরকার যাত্রা শুরু করেছে, তার সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশ্বশক্তির মেরুকরণ ও ভূ-রাজনৈতিক চাপ। বিশেষ করে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের রাজনীতিতে আমেরিকার কৌশলগত স্বার্থ এবং বাংলাদেশের সাথে প্রস্তাবিত বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নিয়ে জনমনে নানাবিধ প্রশ্ন ও সংশয় দেখা দিয়েছে।
বিষয়: জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় বৈদেশিক চুক্তির কৌশলগত সংশোধন প্রস্তাব। • রেসিপ্রোসিটি (Reciprocity) নিশ্চিত করা: চুক্তিতে আমেরিকার চাহিদার বিপরীতে বাংলাদেশের জন্য শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা (Duty-Free Access) এবং হাই-টেক প্রযুক্তি হস্তান্তরের আইনি গ্যারান্টি অন্তর্ভুক্ত করা। • জুডিশিয়াল সেফগার্ড: চুক্তিতে এমন কোনো ধারা রাখা যাবে না যা বাংলাদেশের প্রচলিত আইন বা আদালতের এখতিয়ারকে খর্ব করে। কোনো বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ‘তৃতীয় কোনো দেশ’ বা ‘আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল’-এর চেয়ে দেশীয় আইনি প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। • রিসোর্স প্রোটেকশন: বঙ্গোপসাগর বা অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনের ক্ষেত্রে কোনো একক দেশকে একচেটিয়া অধিকার না দিয়ে ‘মাল্টি-ব্যারেল’ বা বহুমুখী অংশীদারিত্বের নীতি গ্রহণ করা। সুপারিশ: সংসদে তোলার আগে একটি নিরপেক্ষ ‘জাতীয় বিশেষজ্ঞ কমিশন’ দিয়ে চুক্তির প্রতিটি শব্দ যাচাই করা এবং বিতর্কিত ধারাগুলোতে ‘সংশোধনী’ (Amendment) প্রস্তাব করা।ইতিহাস সাক্ষী, কোনো বড় গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে নবগঠিত সরকারগুলোকে প্রায়শই বিদেশি শক্তির নানামুখী চাপের সম্মুখীন হতে হয়। অনেক সময় ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় বা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রয়োজনে এমন কিছু চুক্তির প্রস্তাব সামনে আসে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন খবরে আমেরিকার সাথে প্রস্তাবিত চুক্তির যে রূপরেখা দেখা যাচ্ছে, তা নিয়ে সচেতন মহলে বিতর্ক ওঠা স্বাভাবিক। বিশেষ করে, এই চুক্তিগুলো যদি একপাক্ষিক হয় কিংবা আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ ও ভূখণ্ডের ওপর অন্যের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, তবে তা জুলাই বিপ্লবের মূল চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক হবে। |
আমাদের নীতিনির্ধারকদের একটি বড় অংশ ব্যবসায়িক বা ধনবাদমুখী দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন। তাদের মনে রাখা প্রয়োজন, পুঁজি বা ব্যবসা তখনই টেকসই হয় যখন রাষ্ট্র স্থিতিশীল এবং স্বাধীন থাকে। বিদেশি শক্তির ওপর অতি-নির্ভরশীলতা অনেক সময় অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করে। যদি কোনো বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে হাতে নিয়ে বিদেশি শক্তি সরকারকে চাপে রাখার চেষ্টা করে, তবে সেই আগুনেই দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুড়ে ছাই হতে পারে। এমতাবস্থায় সরকারের উচিত হবে ‘সাপও মরে লাঠিও ভাঙে না’—এমন একটি মধ্যপন্থা বা কৌশলগত অবস্থান গ্রহণ করা। প্রথমত, যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সরাসরি সই না করে জাতীয় সংসদে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ দিতে হবে। সংসদীয় তদারকি কেবল স্বচ্ছতাই নিশ্চিত করে না, বরং বিদেশি চাপের মুখে সরকারকে একটি রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে সুরক্ষা দেয়। সরকার আমেরিকাকে স্পষ্ট বলতে পারে যে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনমতের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো অসম চুক্তি করা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হতে হবে বহুমুখী। কেবল একটি পরাশক্তির বলয়ে বন্দি না থেকে আঞ্চলিক শক্তি এবং উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোলে বিদেশি শক্তির দরকষাকষির ক্ষমতা এমনিতেই কমে আসে। পরিশেষে, বর্তমান সরকারের শক্তির উৎস হওয়া উচিত এ দেশের মানুষ, কোনো বিদেশি রাজধানী নয়। জুলাই বিপ্লবের রক্তভেজা মাটিতে দাঁড়িয়ে কোনো একপাক্ষিক বা দাসত্বমূলক চুক্তি এ দেশের সচেতন সমাজ মেনে নেবে না। আমরা আমেরিকার বন্ধু হতে চাই, কিন্তু অংশীদার হতে চাই সমতার ভিত্তিতে।সরকার যদি জাতীয় স্বার্থকে সবার উপরে রেখে সাহসের সাথে দরকষাকষি করতে পারে, তবেই দেশ ও মানুষের প্রকৃত মঙ্গল নিশ্চিত হবে। অন্যথায়, ইতিহাসের কাঠগড়ায় আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। |