পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের রাজনীতি ও সংকটের রূপরেখা
২০২৪ সালের আগস্ট মাসে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি এক নজিরবিহীন ও জটিল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নোবেল পাওয়া ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্র সংস্কার ও একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করলেও, মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক মেরুকরণ, বড় দলের অংশগ্রহণ নিয়ে বিতর্ক এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং দেশের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর চোখ রাখলে যা সামনে ভেসে উঠে তার বিশ্লষণ করলে যা পাওয়া যায় তারই এক বিস্তারিত বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দলকে বাদ দিয়ে নির্বাচন বিতর্ক
বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে বর্তমান রাজনৈতিক ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা বা বাদ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে গভীর বিতর্ক চলছে।
গণতান্ত্রিক বহুমাত্রিকতার সংকট: রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের একটি অংশের মতে, দেশের অন্যতম বৃহৎ এবং ঐতিহাসিক রাজনৈতিক শক্তিকে সম্পূর্ণ বাইরে রেখে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তা পূর্ণাঙ্গ ‘অংশগ্রহণমূলক’ বা ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ গণতন্ত্রের (Inclusive Democracy) শর্ত পূরণ করে না। বহুদলীয় গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো সব মত ও দলের জনগণের ভোটাধিকার এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।বিপরীত যুক্তি ও সংস্কারের দাবি: অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকার ও ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত পক্ষগুলোর দাবি, গত দেড় দশকে দলটির শাসনামলে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করা হয়েছে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। তাদের মতে, রাষ্ট্রযন্ত্রের আমূল সংস্কার এবং বিগত সময় ঘটে যাওয়া অনিয়ম ও সহিংসতার জবাবদিহি নিশ্চিত না করে তাৎক্ষণিকভাবে দলটিকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় শামিল করা হলে তা গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনার পরিপন্থী হবে।
২. আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক স্থবিরতা (বর্তমান অরাজকতা)
সরকার পতনের পর থেকে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বড় ধরনের রদবদল এবং পুলিশ বাহিনীর চেইন অব কমান্ডে ভাঙন ধরার কারণে দেশের আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
-
প্রশাসনিক অচলবস্থা: তৃণমূল পর্যায়ের আরক্ষী ব্যবস্থা (পুলিশিং ব্যবস্থা) পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ায় বিভিন্ন স্থানে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা, বিক্ষুব্ধ জনতার আইন বহির্ভূত বিচার (মব জাস্টিস) এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক সহিংসতার ঘটনা ঘটছে।
অর্থনৈতিক ও জনজীবনে প্রভাব: বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে শ্রমিক অসন্তোষ, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে সিদ্ধান্তহীনতার কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হয়েছে যে, “কোনো কিছুই ঠিকমতো চলছে না”।
বাংলাদেশের রাজনীতি কোনদিকে হাঁটছে?
বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ তিনটি মূল স্রোতের ওপর নির্ভর করছে:
১. সংস্কার বনাম নির্বাচন: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংবিধান, নির্বাচন আয়োগ (কমিশন), বিচার বিভাগ এবং দুর্নীতি দমন আয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কারের ওপর জোর দিচ্ছে। তবে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংস্কার শেষ করে একটি সুনির্দিষ্ট নির্বাচনী রূপরেখা (রোডম্যাপ) দাবি করছে।
২. নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অগ্রগামীরা (নেতারা) এবং নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিরা একটি নতুন ধারার রাজনীতি ও রাজনৈতিক দল গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছেন, যা ঐতিহ্যগত দ্বি-দলীয় ধারার বাইরে একটি বিকল্প ধারা তৈরি করতে পারে।
পরিশেষে:
বাংলাদেশ বর্তমানে এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে দীর্ঘদিনের স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও একটি বড় রাজনৈতিক পক্ষকে বাদ দিয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বৈধতা সংকট—এ দুইয়ের দোলাচলে দেশ পার করছে এক কঠিন সময়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যত দ্রুত আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে এবং সব পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করে নির্বাচন দিতে পারবে, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনের বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা।
-হারুনূর রশীদ, লণ্ডন, ২০২৬।
নিউজটি শেয়ার করতে বাটনের উপর ক্লিক করুন