প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ রচিত ‘লালসালু’(প্রকাশকাল ১৯৪৮) বাংলা সাহিত্যের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও যুগান্তকারী সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস।
খ্যাতিমান সাহিত্যিক প্রয়াত সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ প্রণীত ‘লালসালু’ উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে তাঁর এক অনবদ্য অবদান। প্রকাশের পর হতেই তার এ লালসালু নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। ব্যত্যয় থাকার কারণেই মনে হয় কিছুটা সমালোচনাও যে নেই তা’নয়। তবে সমালোচনার চেয়ে আলোচনাই বেশী এবং সেসকল আলোচনার সবকিছুই ইতিবাচক আলোচনা।
‘লালসালু’ প্রকাশনার ৭৮বছর পর ইন্টারনেট যুগে এসে লন্ডন থেকে “সৃজন স্টাডি সার্কেল” নামের লণ্ডন ভিত্তিক একটি সাংস্কৃতিক সংস্থা গেলো ১ নভেম্বর ২০২৬সাল এক অন্তর্জাল আলোচনার আয়োজন করে। একজন দর্শক হিসেবে আমিও সে আলোচনা দেখতে ও শুনতে যেই অন্তর্জালে আঙ্গুলের চাপ দিয়ে প্রবেশ করলাম- আলোচকদের দেখে মনে হলো দেখা ও বুঝার মতো কিছু শুনতে পারবো! কিন্তু বাংলায় একটি কথা আছে না, ‘বিধি বাম’! আমার বেলায়ও ঘটলো তাই। মিনিট পাঁচেক দেখার পর আমার মোবাইলের শক্তি শেষ হয়েগেলো। আমি পুরো আলোচনা দেখা ও শুনা থেকে বঞ্চিত হলাম।
প্রয়াত ওয়ালী উল্লাহ মহোদয়ের উক্ত উপন্যাসের আসল কথা নিয়ে অল্প কিছু আলোচনা করা যাক।
উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু ও কাহিনী সংক্ষেপে-
- পটভূমি: ১৯৪০-৫০ দশকের গ্রামীণ বাংলাদেশের মহব্বতনগর নামের এক শস্যহীন, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও অনুন্নত গ্রামের প্রেক্ষাপটে উপন্যাসটি রচিত। [1, 2, 3]
- মজিদের প্রতারণা: কাহিনীর প্রধান চরিত্র মজিদ এক ধূর্ত ও প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন লোক। সে পেটের তাগিদে এবং ক্ষমতার লোভে গ্রামের এক অজ্ঞাতনামা পুরোনো কবরকে অলৌকিক ‘মুদাসসির পীরের মাজার’ হিসেবে ঘোষণা করে। কবরটিকে লাল কাপড়ে (লালসালু) মুড়ে সে মাজারের খাদেম বনে যায়। [1, 2, 3, 4, 5]
- গ্রামের সহজ- সরল মানুষের প্রতি প্রতারণা: এদেশের ধর্মভীরু ও সহজ-সরল গ্রামবাসীদের অন্ধ বিশ্বাস, ভয় ও কুসংস্কারকে পুঁজি করে মজিদ ক্ষমতার শিখরে আরোহণ করে। সে গ্রামের মাতব্বর খালেক বেপারীকেও নিজের প্রভাবের অধীনে আনে। [1, 2, 3]
- প্রতিবাদী স্ত্রী জমিলা: মজিদ রহিমা নামের এক অনুগত স্ত্রীকে বিয়ে করে। পরবর্তী সময়ে সে কিশোরী জমিলাকে বিয়ে করে। জমিলা ছিল অবাধ্য ও প্রতিবাদী—যে ভণ্ডামির কাছে মাথা নত করতে শেখে না, এবং যার করুণ পরিণতি উপন্যাসে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। [1, 2]
- সমাজচিত্র ও ধর্ম নিয়ে ব্যবসা: ধর্মকে কীভাবে জীবিকা ও ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার করা হয়, তা এই উপন্যাসে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
- প্রতীকী রূপ: উপন্যাসের ‘লালসালু’ কেবল একটি লাল কাপড় নয়, এটি গ্রামীণ মানুষের ওপর চেপে বসা ভণ্ডামি, অন্ধবিশ্বাস ও শোষণের এক প্রতীক।
- স্বীকৃতি: এই উপন্যাসের জন্য সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ১৯৬১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। উপন্যাসটি ইংরেজিতে ‘Tree Without Roots’ নামে অনূদিত হয়েছে এবং পরবর্তীতে তানভীর মোকাম্মেল এটি নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। [1, 2, 3, 4, 5, 6]
উপন্যাসটির বিস্তারিত পাঠের জন্য আপনি
উইকিপিডিয়া দেখতে পারেন।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘লালসালু’ উপন্যাসের মূল প্রতীকী দিক এবং প্রধান তিনটি চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক রূপরেখা নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
১. মূল প্রতীকী দিক (Symbolic Aspects)
- লালসালু কাপড়ের প্রতীক: উপন্যাসে ‘লালসালু’ বা লাল কাপড়টি কেবল একটি মাজারের আবরণ নয়, এটি ভণ্ডামি, অন্ধবিশ্বাস এবং শোষণের প্রতীক। এই লাল কাপড় দিয়ে মজিদ মূলত গ্রামবাসীদের চোখ ও বিবেককে ঢেকে দেয়, যার ফলে কেউ মাজারের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস পায় না।
- শস্য বনাম ধর্ম: উপন্যাসের শুরুতে মহব্বতনগর গ্রামের মানুষের ক্ষুধার্ত ও শস্যহীন রূপ দেখানো হয়েছে। মজিদ মানুষের এই ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক অসহায়ত্বকে পুঁজি করে। সে শস্যের অভাবকে ধর্মের ভয় দেখিয়ে আড়াল করে এবং আধিপত্য বিস্তার করে।
- মাজার ও তাহের-কাদেরের বাপের ঘর: মাজারটি যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু, সেখানে তাহের-কাদেরের ঘরটি গ্রামীণ পারিবারিক ভাঙন ও শোষণের শিকার হওয়া সাধারণ মানুষের প্রতীক।
২. চরিত্র বিশ্লেষণ (Character Analysis)
মজিদ: ধূর্ত শোষক ও অস্তিত্বের লড়াই
- অস্তিত্বের সংকট: মজিদ কোনো জন্মগত অপরাধী নয়; সে মূলত তার শস্যহীন নিজের অঞ্চল থেকে বাঁচার তাগিদে, অর্থাৎ অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে মহব্বতনগর গ্রামে আসে।
- ধূর্ত ও মনস্তাত্ত্বিক চালক: সে অত্যন্ত প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন। গ্রামের মানুষের মনস্তত্ত্ব সে খুব ভালো বোঝে। ভয় এবং ধর্মের মেলবন্ধন ঘটিয়ে সে পুরো গ্রামকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখে।
- ভেতরের ভয়: মজিদ বাইরে যতোটাই শক্তিশালী, ভেতরে সে ততোটাই একা ও ভীত। জমিলা যখন তার ক্ষমতার ভিত্তি কাঁপিয়ে দেয়, তখন তার ভেতরের এই নিরাপত্তাহীনতা ও দুর্বলতা প্রকাশ পেয়ে যায়।
রহিমা: চিরায়ত গ্রামীণ নারী ও অন্ধ আনুগত্য
- ভয় ও ভক্তি: রহিমা মজিদের প্রথম স্ত্রী। সে চওড়া হাড়ের, শক্ত-সমর্থ এবং মজিদের প্রতি সম্পূর্ণ অনুগত এক নারী। মজিদের খোদাভীতিকে সে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে এবং মজিদকে সমীহ করে চলে।
- মাতৃত্ব ও সরলতা: রহিমার কোনো সন্তান নেই, যা তার জীবনের একটি বড় ট্র্যাজেডি। জমিলার আগমনের পর তার মধ্যে এক ধরণের মাতৃসুলভ বাৎসল্য জেগে ওঠে।
- দ্বন্দ্ব: উপন্যাসের শেষে জমিলার ওপর মজিদের অত্যাচার দেখে রহিমার সরল বিশ্বাসের ভিত কেঁপে ওঠে। সে মজিদকে প্রথমবার প্রশ্ন করে বসে, যা তার ভেতরের সুপ্ত মানবিকতার জাগরণকে নির্দেশ করে।
জমিলা: অবাধ্য যৌবন ও প্রতিবাদের প্রতীক
- স্বাধীনচেতা ও প্রাণচঞ্চল: জমিলা মজিদের দ্বিতীয় স্ত্রী। সে বয়সে তরুণী, চঞ্চল এবং গ্রামীণ কুসংস্কার বা মাজারের ভণ্ডামির ব্যাকরণ সে বোঝে না।
- নীরব প্রতিবাদ: মজিদ তাকে ধর্মের ভয় দেখিয়ে ও নিয়ম-কানুনের শৃঙ্খলে বেঁধে নিজের বশে আনার চেষ্টা করে। কিন্তু জমিলা মজিদের মুখে থুতু দিয়ে এবং মাজারের দেয়ালে লাথি মেরে তার ভেতরের অবাধ্য যৌবন ও ভণ্ডামির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদপ্রকাশ করে।
- করুণ পরিণতি: মজিদ তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য ঝড়ের রাতে মাজারের খুঁটির সাথে বেঁধে রাখে। পরদিন সকালে মাজারের ওপর জমিলার চিত হয়ে পড়ে থাকা নিথর দেহটি মজিদের সাজানো ভণ্ড সাম্রাজ্যের গালে একটি চড় এবং শোষিত নারীশক্তির এক অবিনাশী প্রতীক।
নিউজটি শেয়ার করতে বাটনের উপর ক্লিক করুন