মবতন্ত্র ও মৌলবাদের উত্থান: বিপন্ন গণতন্ত্র রক্ষায় বৃহত্তর ঐক্য খুবই অপরিহার্য
বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট এক গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যেখানে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় আইনের শাসন এবং নাগরিক অধিকার প্রধান স্তম্ভ হওয়ার কথা, সেখানে সাম্প্রতিক সময়ে ‘মব কালচার’ বা মবতন্ত্র (Mobocracy), উগ্রপন্থা এবং বিচারহীনতার এক আশঙ্কাজনক সংস্কৃতি ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সভা-সমাবেশ বা প্রতিনিধি সভায় হামলার ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন সাধারণ অপরাধ নয়। এটি মূলত দেশের প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক শক্তির কণ্ঠরোধ করার একটি পদ্ধতিগত ও ধারাবাহিক অপচেষ্টা। যখন কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রে উগ্রপন্থী ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির তোষণ নীতি শুরু হয়, তখন মুক্তবুদ্ধি চর্চা ও গণতান্ত্রিক অধিকার স্বাভাবিকভাবেই প্রথম আঘাতের শিকার হয়।
উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান ও মব জাস্টিসের রূপ
সাম্প্রতিক বছরগুলোর মানবাধিকার পরিস্থিতি ও গণমাধ্যমের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির নামে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, গত কয়েক বছরে গণপিটুনিতে হতাহতের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে ঊর্ধ্বমুখী। কেবল সন্দেহ বা ভিন্নমতের জেরে প্রকাশ্য দিবালোকে পিটিয়ে হত্যার মতো নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটছে, যার শিকার হচ্ছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে প্রান্তিক মেহনতি মানুষ। রাজনৈতিক বা আদর্শিক ভিন্নমতের কারণে সভা-সমাবেশে হামলা এবং ঘরবাড়ি-উপাসনালয় ভাঙচুরের ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু বিচার না হওয়ায় অপরাধীদের মধ্যে এক ধরনের ‘সংস্কৃতিগত পার পেয়ে যাওয়ার মানসিকতা’ (Impunity) তৈরি হয়েছে। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, সমাজ থেকে পরমতসহিষ্ণুতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ দ্রুত বিলুপ্ত হচ্ছে।
সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়
এই মব সংস্কৃতির সামাজিক প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও ভয়াবহ। একটি সুস্থ সমাজে নাগরিকেরা যেখানে রাষ্ট্র ও আইনের কাছে নিরাপত্তা আশা করেন, সেখানে মবতন্ত্রের কারণে মানুষের মধ্যে চরম এক মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হচ্ছে। এটি সমাজে পারস্পরিক অবিশ্বাসের জন্ম দিচ্ছে, যার ফলে সামাজিক সংহতি (Social Cohesion) ভেঙে পড়ছে। যুক্তি, বুদ্ধিবৃত্তি ও মুক্তমনা সংস্কৃতির স্থান দখল করছে অন্ধ হুজুগ এবং উগ্র ধর্মান্ধতা। যখন মৌলবাদী ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক প্রশ্রয় পায়, তখন প্রগতিশীল চিন্তা ও নারীদের অবাধ চলাচল ও ক্ষমতায়ন প্রথম ধাক্কাটি খায়। এর ফলে সমাজ মধ্যযুগীয় বর্বরতার দিকে ধাবিত হয়, যা একটি আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব
রাজনৈতিক অস্থিরতা, মবতন্ত্র এবং উগ্রবাদের বিস্তার কেবল সামাজিক ক্ষতিই করে না, বরং দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়। যেকোনো দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রথম শর্ত হলো— স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন।
উত্তরণের পথ ও বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মব জাস্টিস বা উন্মত্ত জনতার আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা তখনই বাড়ে, যখন প্রাতিষ্ঠানিক বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা সংকটে পড়ে অথবা রাষ্ট্রযন্ত্র কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে রাজনৈতিক সুবিধা দিতে গিয়ে তাদের অপরাধের প্রতি চোখ বুজে থাকে। এই তোষণ নীতি সাময়িক রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে পারলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা পুরো রাষ্ট্রকাঠামোকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।
এই চরম সংকটকাল থেকে উত্তরণের জন্য প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক শক্তির আত্মশুদ্ধি এবং আত্মসমালোচনা। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভেদ, পারস্পরিক সংকীর্ণতা এবং ব্যক্তিগত বা দলীয় মান-অভিমান আজ চরমপন্থী শক্তির জন্য মাঠ তৈরিতে সাহায্য করছে। ইতিহাস বলে, প্রগতিশীল শক্তির ভেতরের ফাটলকে পুঁজি করেই সবসময় উগ্রবাদের উত্থান ঘটেছে। তাই আজ সময় এসেছে সমস্ত কৃত্রিম বিভেদ ভুলে একটি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার। এই ঐক্যের মূল ভিত্তি হতে হবে— মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা, ধর্মনিরপেক্ষতা, সত্যিকারের বহুত্ববাদী গণতন্ত্র এবং আইনের শাসন।