ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, যুক্তরাজ্য শাখার সমাবেশ
২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশে পঁচিশে মার্চ সরকারিভাবে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। একটি জনগোষ্ঠীর স্বাধিকারের দাবিকে চিরতরে মুছে দিতে পাকিস্তানের পরিকল্পিত এই হত্যাযজ্ঞের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন সার্চলাইট’।
পূর্ব লন্ডনের আলতাব আলী পার্কের শহীদ মিনারে ২৫শে মার্চ মঙ্গলবার যুক্তরাজ্য একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আয়োজনে ভাবগাম্ভীর্য পরিবেশে পালিত হয়েছে জাতীয় গণহত্যা দিবস। অনুষ্ঠানের শুরুতে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে যারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং রণাঙ্গনে যে সকল বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রাণ হারিয়েছেন তাঁদের স্মরণে একমিনিট নীরবতা পালন, প্রদীপ প্রজ্জ্বলন এবং শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়ে শহীদ মিনারের বেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক জুয়েল রাজ এর সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন সভাপতি সৈয়দ এনামুল ইসলাম।
সৈয়দ এনাম তাঁর বক্তব্যে ২৫শে মার্চ কাল রাত্রিতে অপারেশন সার্চ লাইট নাম দিয়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ঘুমন্ত বাঙালির উপর কিভাবে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে তা তুলে ধরেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ঘাতকদের বিচারের জন্য মহিয়সী নারী শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা রুমির মাতা শ্রদ্ধেয় জাহানারা ইমাম একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি যে গঠন করেছেন তার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর দোসর কিছু যুদ্ধাপরাধীর বিচার হলেও অধিকাংশ যুদ্ধাপরাধী এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরে। তাদের অবশ্যই বিচার করতে হবে, সে সঙ্গে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর যারা হত্যাযজ্ঞ সাধন করেছে তাদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে।
গণহত্যা দিবসকে স্মরণ করে অনুষ্ঠানে উপস্থিত যে সকল বীর মুক্তিযোদ্ধারা বক্তব্য রাখেন তাঁরা হলেন, ফয়জুর বহমান খান, সংগঠনের উপদেষ্টা আবু মুসা হাসান ও গৌস সুলতান।
মুক্তিযোদ্ধারা সকলেই তাঁদের বক্তব্যে বলেন, ২৫শে মার্চ সারা দেশে এবং সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে ঢুকে ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, কর্মচারীদের হত্যা করেছে হানাদাররা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুররহমানের ঐতিহাসিক সাতই মার্চের ভাষণ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম … প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো, শুনে তাঁরা উদ্ধুদ্ধ হয়েছিলেন এবং পরে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। তাঁরা আরো বলেন, ২৫ শে মার্চ যেমন বিভীষিকাময় কাল রাত্রি, তেমনি প্রতিরোধের রাতও বলা যায়।
তাঁরা বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ প্রকৃত অর্থেই ছিল জনযুদ্ধ। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই সর্বাত্মক এই যুদ্ধে শামিল হয়েছিল সমানভাবে। পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক নারীর ওপর নিপীড়ন, ধর্ষণ, লাঞ্ছনা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে বাছ-বিচারহীনভাবে। ২৫শে মার্চ যেমন হত্যাযজ্ঞ হয়েছে, তেমনি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নয় মাস গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ, অগ্নি সংযোগ করে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেশকে ছারখার করে দিয়েছে হানাদাররা। শুধু ঢাকা শহর নয়, সারা দেশেই এই গণহত্যা হয়েছে। একাত্তরের ১২ই মে খুলনার চুকনগরে এক দিনেই ১২ হাজার মানুষকে হত্যা করেছে হানাদাররা।
গণহত্যা স্মরণ অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সাবেক সভাপতি সৈয়দ আনাস পাশা, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ড. আনসার আহমেদ উল্লাহ, সহ-সভাপতি নিলুফা ইয়াসমীন হাসান, সহ -সভাপতি জামাল আহমেদ খান, সহ সাধারণ সম্পাদক শাহ বেলাল, সহ -সভাপতি মুনিরা পারভীন, সহ -সভাপতি স্মৃতি আজাদ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দা নাজনীন শিখা, সংগঠনের উপদেষ্টা কবি হামিদ মোহাম্মদ, সাংবাদিক মতিয়ার চৌধুরী, নাজমা রহমান, উদিচীর সভাপতি নুরুল ইসলাম, সিপিবির সহকারী সাধারণসম্পাদক শাহরিয়ার বিন আলী, জাসদ এর সহ-সভাপতি কবি মজিবুল হক মণি, সাংস্কৃতিক কর্মী শাহাবুদ্দিন বাচ্চু, অসীমা দে, সৈয়দ হামিদুল হক, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ এর সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল আহাদ চৌধুরী, সাবেক ডেপুটি মেয়র শহীদ আলী, শতরূপা চৌধুরী, এম এইচ মিঠু, রানা মাহের, লিপি ফেরদৌসী প্রমুখ।
উপস্থিত বক্তারা একাত্তরে বাংলাদেশে যে নিষ্ঠুরতম গণহত্যা হয়েছে তার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতির দাবী জানান।
কাল রাত্রির স্মরণ অনুষ্ঠানে গণহত্যা নিয়ে স্বরচিত কবিতা ‘আমি বীরাঙ্গনা’ পাঠ করেন কবি ও অভিনয় শিল্পী মাহফুজা তালুকদার।
কবিতার পর শিল্পী শতরূপা চৌধুরীকে নিয়ে সমবেত কন্ঠে হয় দেশাত্মবোধক গান এবং জাতীয় সংগীত। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা ড. আনসার আহমেদ উল্লাহ ঘাতকদের বিচারের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
“হিন্দু এইড ইউকে” দাতব্য ও উন্নয়নের জন্য গালা ডিনার আয়োজন
গত ২৯ মার্চ ২০২৫ তারিখে হিন্দু এইড ইউকে, একটি সফল গালা ডিনার আয়োজন করে, যেখানে সম্প্রদায়ের নেতা, শিল্পী এবং সমর্থকরা সংস্কৃতি, জনহিতকরতা এবং উদযাপনের একটি সন্ধ্যায় একত্রিত হয়েছিল।
যুক্তরাজ্য এবং বিদেশে দাতব্য প্রকল্পগুলিকে সমর্থন করার জন্য আয়োজিত এই অনুষ্ঠান মনোমুগ্ধকর ছিল। অনুষ্ঠানটি সুন্দরভাবে পরিচালনা করে হিন্দু এইড ইউকের নন্দিতা সাহা, চঞ্চু দেব গুপ্ত (জয়িতা) এবং রঞ্জিতা সেন।
সন্ধ্যা ৭ টায় উষ্ণ অভ্যর্থনা এবং গীতা পাঠের মাধ্যমে সন্ধ্যা শুরু হয়।
![]() |
প্রধান সমন্বয়কারী ডঃ সুকান্ত মৈত্র স্বাগত বক্তব্য রাখেন, এরপর হিন্দু এইড সদস্যদের একটি সুন্দর সমবেত পরিবেশনা পরিচালনা করেন চঞ্চু দেব গুপ্ত (জয়েতা)। মিহির সরকারের উদ্বোধনী বক্তৃতায় সংগঠনের পটভূমি, লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য তুলে ধরা হয়। এরপর স্যার স্টিফেন টিমস(এমপি) দাতব্য উদ্যোগ এবং সামাজিক সম্পৃক্ততার গুরুত্ব সম্পর্কে শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন। এরপর বিভিন্ন সঙ্গীত পরিবেশন করেন রঞ্জিতা সেন, সঞ্জয় দে, শর্মিলা দাস, গৌরী চৌধুরী এবং লাবণী বড়ুয়া। শুচিস্মিতা মৈত্রের পরিচালনায় এবং নন্দিতা সাহার পরিচালনায় শিশুরা ধর্মীয় শ্লোকগুলি আবৃত্তির করে।
দাতব্য কাজে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ড সুনীল রায় এবং ড চিত্ত চৌধুরীকে “এক্সিলেন্ট ফিলানথ্রপিস্ট” পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অংশে শিশুরা গীতিমূলক পরিবেশনায় অংশগ্রহণ করে। নৃত্য পরিবেশনা সন্ধ্যায় প্রাণবন্ততা যোগ করে, যেখানে অর্থিকা সাহা, প্রেরণা মণ্ডল, শুভশ্রী সরকার, নিগি এবং আদিত্য রায় মনোমুগ্ধকর রুটিন পরিবেশন করেন।
অনুষ্ঠানে শান্তনু দাসের হিন্দু এইড ইউকে-এর যাত্রা এবং প্রভাব সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন। সন্ধ্যার একটি উল্লেখযোগ্য আকর্ষণ ছিল অজিত সাহার ভবিষ্যত প্রকল্পগুলির উপস্থাপনা।
![]() |
অনুপম সাহার নেতৃত্বে স্পনসরদের সম্মানিত করার জন্য বিশেষ স্বীকৃতি অনুষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত ছিল। এতে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে সম্প্রদায়-চালিত প্রচেষ্টার গুরুত্ব তুলে ধরেন। রয়্যাল মিত্র, কমল সাহা এবং অন্যান্যদের সহ স্পনসর এবং আতিথেয়তা দলের অবদানকে তাদের অমূল্য সহায়তার জন্য স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
সংগঠনের কোষাধ্যক্ষ সুজয় সাহা আন্তরিক তহবিলের আবেদন করেন, উপস্থিতদের তাদের সমর্থন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানটি অবন্তী সিথি এবং অমিত দে-এর চূড়ান্ত কণ্ঠ পরিবেশনার মাধ্যমে শেষ হয়।
সন্ধ্যাটি দীপ শর্মা এবং চিন্ময় চৌধুরীর ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মাধ্যমে শেষ হয়। অনুষ্ঠানের সমন্বয়কারী ছিলেন অজিত সাহা। এই অনুষ্ঠান থেকে সংগৃহীত তহবিল দাতব্য প্রকল্পগুলি সম্প্রসারণ এবং মানবিক সহায়তা প্রদান এবং সামাজিক উন্নয়ন প্রচারের সংস্থার লক্ষ্য অব্যাহত রাখতে ব্যবহার করা হবে।
স্বাধীনতা দিবসে ইউকে বাংলা রিপোর্টার্স ইউনিটির
আলোচনা, আবৃত্তি ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ
যথাযোগ্য মর্যাদা ও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পূর্ব লন্ডনে ইউকে বাংলা রিপোর্টার্স ইউনিটির উদ্যোগে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে আলোচনা, আবৃত্তি ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণের মাধ্যমে উদযাপন করা হয়।
২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের ইফতার পূর্ব আলোচনা পর্বে পূর্বলন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস এর ভ্যালেন্স রোডের পিউর চা-ই এর সেমিনার হলে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন ইউকে বাংলা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি অধ্যাপক সাজিদুর রহমান। সভা পরিচালনা করেন রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মীরু।
এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ৭১”র মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্য রাখেন- ৪নং সেক্টরের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মো. আমীর খান।
![]() |
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আমীর খান- ৭১’র শহীদের আত্মত্যাগ এবং বীরাঙ্গনা মা-বোনদের অপরিসীম ত্যাগ ও ভূমিকার কথা স্মরণ করেন। তিনি ৪নং সেক্টরের রণাঙ্গনের ৭১’র মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ স্মৃতিচারণ তুলে ধরে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন।
অনুষ্ঠানে কবি শামসুর রাহমানের কবিতা “তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা“ আবৃত্তি করেন আবৃত্তি শিল্পী ফাহমিদা খাতুন এবং স্বরচিত কবিতা “আমি স্বাধীনতটাকে খুঁজছি” পাঠ করেন- মুহাম্মদ শাহেদ রাহমান।
আলোচনা পর্বে বক্তব্য রাখেন ইউকে বাংলা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সভাপতি ড. আনসার আহমদ উল্লাহ, সাবেক সভাপতি অধ্যক্ষ মুহাম্মদ শাহেদ রাহমান, রিপোর্টার্স ইউনিটির সহ সভাপতি সাহেদা রহমান, মিডিয়া এন্ড আইটি সেক্রেটারী এ রহমান অলি, অর্গানাইজিং এন্ড ট্রেনিং সেক্রেটারি এমডি সুয়েজমিয়া, সদস্য শামীম আশরাফ প্রমুখ।
সভায় বক্তারা মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ৭১”র স্বাধীনতার সময় দেশি-বিদেশী সাংবাদিকদের ত্যাগ তিতিক্ষার কথা তুলে ধরে ভবিষ্যতে একটি সেমিনারের আয়োজন করার প্রস্তাব করেন বক্তারা।
সভায় অংশ নেন – কলামিস্ট জিয়াউল সৈয়দ, রিপোর্টার্স ইউনিটির সহ কারী সম্পাদক এসকেএম আশরাফুল হুদা, জগন্নাথপুর টাইমস এর রিপোর্টার সুহেল আহমদ, সাংবাদিক মুন্না মিয়া, মুহাম্মদ এফ ইসলাম, সৈয়দ মামুন সহ অসংখ্য কমিউনিটি এক্টিভিস্ট ও সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মীবৃন্দ।