| দেশের প্রয়োজন একজন (‘স্টেটসম্যান’) রাষ্ট্রনায়ক প্রয়োজন তরুণদের মেধা আর বিএনপির তৃণমূল শক্তির সমন্বয় |
|
জুলাই অভ্যুত্থানে বিএনপির ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং জনমনে নানামুখী বিশ্লেষণ রয়েছে। সমকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে এই বিষয়টিকে কেবল ‘একক কোনো দলের কাজ’ হিসেবে না দেখে একটি বহুমাত্রিক(‘মাল্টি-লেয়ার্ড’) ঘটনা হিসেবেই দেখা সঠিক হবে বলে মনে হয়। বিএনপি এই অভ্যুত্থানের অন্যতম ‘প্রধান রাজনৈতিক চালিকাশক্তি’ ছিল কি না, এ নিয়ে অনেক কথাই বলা যায় তবে তার আগে নিচের যুক্তিগুলো বিবেচনা করে দেখা যেতে পারে:- |
|
অভ্যুত্থানের অন্যতম ‘প্রধান রাজনৈতিক চালিকাশক্তি’ কে বা কি ছিল? প্রথমতঃ আন্দোলনের শুরু এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা জুলাই আন্দোলনের শুরুটা হয়েছিল সাধারণ শিক্ষার্থীদের হাত ধরে, যা ছিল মূলত ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন’। তবে আন্দোলনের তীব্রতা যখন বাড়তে থাকে এবং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন শুরু হয়, তখন বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠনগুলো (ছাত্রদল, যুবদল) রাজপথে সক্রিয় হয়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজপথের অভিজ্ঞতা এবং তৃণমূলের কম্পুটার জালিকাব্যবস্থা(নেটওয়ার্ক) এই আন্দোলনকে একটি দেশব্যাপী ‘গণ-অভ্যুত্থানে’ রূপ দিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। |
|
অনেকে মনে করেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে ও পরে বিএনপি যে ‘একদফা’ দাবি নিয়ে কাজ করছিল, জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলন সে দাবি আদায়ের একটি বড় সুযোগ তৈরি করে দেয়। বিএনপি কৌশলগতভাবে এই আন্দোলনকে সমর্থন দিয়েছিল এবং তাদের নেতা-কর্মীরা সাধারণ মানুষের বেশে রাজপথে সক্রিয় ছিল বলে অনেক গোয়েন্দা ও রাজনৈতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সমন্বিত রূপে বলতে গেলে বলা যায় যে, এটি ছিল ছাত্র-জনতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর একটি ‘অঘোষিত জোট’। ছাত্ররা ছিল আন্দোলনের ‘মুখ’ (Face), আর বিএনপি বা বিরোধী দলগুলো ছিল আন্দোলনের ‘পেশিশক্তি’ ও সরবরাহ মালা(‘সাপ্লাই চেইন’)। আরো ঘনিষ্টভাবে বিশ্লেষণ করে দেখতে গেলে জুলাই অভ্যুত্থানকে কোনো একটি নির্দিষ্ট শক্তির একক কৃতিত্ব দেওয়া কঠিন। তবে এটি সত্য যে, বিএনপির দীর্ঘদিনের সরকারবিরোধী লড়াই এই অভ্যুত্থানের জন্য উর্বর ভূমি তৈরি করেছিল। যদি বিএনপি গত ১৫ বছর ধরে মাঠ গরম না রাখত, তবে হয়তো জুলাইয়ের আন্দোলন এত দ্রুত চূড়ান্ত রূপ পেত না। একনাগারে ১৫ বছর ধরে দেশের রাজনীতির মাঠ গরম রাখার কারণে ছাত্রদের বৈষম্য বিরোধী একটি ছোট্ট পদচারণা রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক শক্তির যুগপৎ বিস্ফোরণ হয়ে দাঁড়ায়। যেখানে বিএনপি ছিল আন্দোলনের ‘কৌশলগত ও সাংগঠনিক ভিত্তি’, আর ছাত্ররা ছিল তার ‘নৈতিক ও আবেগীয় চালিকাশক্তি’। বিএনপি যদি সরাসরি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিত, তা’হলে আন্দোলনটি হিতে বিপরীত হওয়ার ভয়ও কম ছিল না। অভিজ্ঞ মহলের এমন পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত তীক্ষ্ণ এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার এক রূঢ় সত্যকে উন্মোচন করে এবং জুলাই অভ্যুত্থানের পেছনের ‘মাস্টারস্ট্রোক’ বা মূল কৌশলটি বুঝতে সাহায্য করে। |
|
যদিও আন্দোলনের সামনের সারিতে ছাত্ররা ছিল, কিন্তু মাঠ পর্যায়ে বিএনপি এবং অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মী গ্রেফতার হয়েছেন এবং অনেকে প্রাণ দিয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকেও তখন অভিযোগ করা হয়েছিল যে, ছাত্র আন্দোলনের ওপর ভর করে বিএনপি-জামায়াত (‘রেজিম চেঞ্জ’) সরকার পরিবর্তন করতে চাইছে। কেন বিএনপিকে আন্দোলনে মূল শক্তি বলা যায়? এনিয়ে যুক্তি ও পাল্টা যুক্তি উভয়ই আছে। বিএনপি’র পক্ষে বলতে সেই একই কথা পুনঃ উচ্চারণ করতে হয় যে, দীর্ঘ ১৫ বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং বিএনপি’র ধারাবাহিক আন্দোলনই সাধারণ মানুষকে রাজপথে নামার মানসিক শক্তি জুগিয়েছে। বিএনপির সংগঠিত শক্তি ছাড়া এককভাবে ছাত্রদের পক্ষে এত বড় অভ্যুত্থান ঘটানো কঠিন ছিল। ছাত্রদের পক্ষেও বলার যে কিছুই নেই তা’ও বলা সঠিক হবে না। ছাত্রদের দিয়ে শুরু করা এটি ছিল একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণ-জাগরণ। সাধারণ মানুষ কোনো দলের ডাকে নয় বরং ছাত্রদের ওপর অন্যায়ের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিল। বিএনপি কেবল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েছে। |
|||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
![]() |
|
“প্রকাশ্যে” না থাকাটাই ছিল শাপে বর জুলাই আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীরা সামনে থাকায় সরকারের সেই প্রথাগত ‘রাজনৈতিক দমনের’ অস্ত্রটি ভোঁতা হয়ে গিয়েছিল। সাধারণ মানুষের সহানুভূতি ছাত্রদের প্রতি ছিল শতভাগ। বিএনপি সরাসরি নেতৃত্বে থাকলে সাধারণ নাগরিক বা অরাজনৈতিক মানুষ হয়তো “দুই দলের ক্ষমতার লড়াই” ভেবে ঘরে বসে থাকত। কিন্তু ছাত্রদের ‘নির্দোষ’ আন্দোলন দেখে সাধারণ মানুষ দলমত নির্বিশেষে রাস্তায় নেমে এসেছিল। “সুবিধাবাদী নেতা” ও অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা বিশ্বের বহু দেশের রাজনীতিতে ‘ওপেন সিক্রেট’ হিসেবেই থাকে এবং বাংলাদেশেও আছে। এ-কে দেশের রাজনৈতিক মহল ‘বিজনেস-পলিটিক্স নেক্সাস’ বলেই জানেন। অনেক প্রভাবশালী বিএনপি নেতার ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ব্যাংক ঋণ আওয়ামী সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট ছিল। ফলে তারা প্রকাশ্যে রাজপথে নেমে সেই সুবিধা হারাতে চাননি। এই নেতারা আন্দোলনে নামলে হয়তো ভেতর থেকে তথ্য ফাঁস করে দিতেন বা আন্দোলনকে মাঝপথে থামিয়ে দিতেন। আমাদের মত অনেকেরই ধারণায় জুলাইয়ের বড় প্রাপ্তি ছিল—কেন্দ্রীয় পর্যায়ের ‘সুবিধাবাদী’ নেতাদের পাশ কাটিয়ে বিএনপির তৃণমূলের কর্মীরা ছাত্রদের সাথে মিশে গিয়েছিল। তারা কোনো নেতার নির্দেশের অপেক্ষায় না থেকে নিজেদের বিবেকের তাড়নায় এবং দীর্ঘদিনের বঞ্চনার ক্ষোভ থেকে রাজপথে লড়াই করেছে। “জুলাই অভ্যুত্থান সফল হয়েছিল কারণ এটি কোনো বিশেষ নেতার নির্দেশে নয়, বরং নেতার অনুপস্থিতিতে নিচ থেকে ওপরের দিকে (Bottom-up) ধাবিত হয়েছিল।” যদি বিএনপি সরাসরি নেতৃত্ব দিত, তবে হয়তো তা একটি প্রথাগত রাজনৈতিক সংঘাতে সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু পর্দার অন্তরালে থেকে সমর্থন দেওয়া এবং সাধারণ মানুষের বেশে নেতা-কর্মীদের অংশগ্রহণই আন্দোলনকে একটি ‘জাতীয় বিপ্লবে’ রূপ দিয়েছিল।” এখন প্রয়োজন দল ও সরকারকে আদিদুষমুক্ত করা? গতানুগতিক ধারায় ফিরে গিয়ে ক্ষমতার ভাগাভাগিতে গেলে মন্দের দিক ভারী হবে বলেই অভিজ্ঞ রাজনৈতিক মহল মনে করেন। |
|
স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি বর্তমান সরকার ও রাজনীতির জন্য একটি বড় আয়না হতে পারে। |
|
অভিজ্ঞ রাজনৈতিক মহলের মতে বিএনপি যদি গত ১৫ বছরে আওয়ামী সরকারের সুবিধা নেওয়া বা নিষ্ক্রিয় থাকা নেতাদের সরিয়ে জুলাইয়ের রাজপথ কাঁপানো তরুণ ও ত্যাগী নেতাদের সামনে আনেন, তবেই সরকারে গতি ফিরবে। এটি সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করবে যে— “এবার সত্যিই কিছু একটা বদলাচ্ছে।” যা’কে আমরা বলতে পারি- ‘সুবিধাবাদী’ বনাম ‘ত্যাগী’ নেতৃত্বের লড়াই (The Purification)। ইতিমধ্যেই বিএনপি প্রধান, প্রধান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সে লক্ষ্যেই কাজ শুরু করেছেন বলে রাজনৈতিক মহল মনে করছেন। বিজ্ঞ রাজনৈতিকমহল মনে করেন যে গতানুগতিক ধারার সুবিধাবাদীদের সাথে চললে সরকার আগের মতোই ‘সিন্ডিকেট’ ও ‘আমলাতান্ত্রিক’ গ্যাঁড়াকলে আটকা পড়বে। |
|
বাংলাদেশের রাজনীতির চিরচেনা রোগ হলো—এক দল গেলে অন্য দল এসে আগের দলের ওপর দমন-পীড়ন শুরু করে। জুলাইয়ের চেতনা ছিল বৈষম্যহীনতা। তাই বিচার বিভাগ, পুলিশ এবং নির্বাচন কমিশনকে এমনভাবে শক্তিশালী করা উচিত যেন তা কোনো ব্যক্তির বা দলের আজ্ঞাবহ না থাকে। কোনো ব্যক্তি বা দল শক্তিশালী হওয়ার চেয়ে ‘প্রতিষ্ঠান’ শক্তিশালী হওয়া বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ভালো। এতে ভবিষ্যতে অন্য কেউ চাইলেও স্বৈরাচার হতে পারবে না। |
|
জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অবদান হলো একটি অরাজনৈতিক, সচেতন ছাত্র-যুব সমাজ। বিএনপি যদি কেবল নিজের দল সামলানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এই তরুণ প্রজন্মের (Generation Z) আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে পারে, তবে তা দেশের রাজনীতিকে সমৃদ্ধ করবে। তরুণদের মেধা আর বিএনপির তৃণমূল শক্তির সমন্বয় ঘটাতে পারলে বাংলাদেশ একটি আধুনিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রে রূপ নিতে পারবে। বিশ্বের অনেক দেশেই (যেমন: দক্ষিণ কোরিয়া বা চিলি) স্বৈরশাসন পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত সরকারগুলো যখন ‘সততা ও স্বচ্ছতার’ ওপর জোর দিয়েছে, তারা আজ উন্নত দেশ। আর যারা শুধু ‘ক্ষমতার ভাগাভাগি’ নিয়ে ব্যস্ত ছিল, তারা আবারও অস্থিতিশীলতায় ডুবে গেছে। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ভালো হবে যদি বর্তমান সরকার “রাজনৈতিক আত্মম্ভরিতা” ত্যাগ করে “জনগণের সেবক” হওয়ার মডেল গ্রহণ করে। দেশের নতুন নেতৃত্ব যদি গতানুগতিক ‘পলিটিক্যাল বস’ না হয়ে একজন রাষ্ট্রনায়ক(‘স্টেটসম্যান’) হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন, তবেই দেশ ও জাতি পূর্ণতা পাবে। |