মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ১নং রহিমপুর ইউনিয়নের আমরতল-দেওড়াছড়া সড়কের দক্ষিণ বড়চেগ এলাকার দীর্ঘদিনের বেহাল সড়ক সংস্কারে স্বেচ্ছাশ্রমে অংশ নিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বছরের পর বছর অবহেলিত অবস্থায় পড়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় স্থানীয়দের উদ্যোগেই গত শনিবার (৩০ মে) সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত সংস্কার কাজ পরিচালিত হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আমরতল থেকে দেওড়াছড়া সড়কের দক্ষিণ বড়চেগ অংশটি দীর্ঘদিন ধরে খানা-খন্দে ভরা। সামান্য বৃষ্টি হলেই সড়কে পানি জমে কাদার সৃষ্টি হয়। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে ভাঙনের কারণে যানবাহন চলাচল যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি পথচারীদেরও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। প্রতিদিন শত শত মানুষ এই সড়ক ব্যবহার করেন। বড়চেগ এলাকার পাশাপাশি আশপাশের কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দা ও চা-বাগান এলাকার শ্রমিকরাও এই সড়কের ওপর নির্ভরশীল।
স্থানীয় সমাজকর্মী মো. হারুনুর রশিদের নেতৃত্বে এবং স্থানীয় মুরব্বি মো. সিদ্দেক মিয়া ও মো. আফতাব মিয়ার সার্বিক তত্ত্বাবধানে শতাধিক এলাকাবাসী স্বেচ্ছাশ্রমে অংশ নেন। তারা নিজ উদ্যোগে মাটি ফেলে গর্ত ভরাট করে এবং চলাচলের উপযোগী করার জন্য সড়কের বিভিন্ন অংশ সংস্কার করেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন শত শত স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাগামী শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ীসহ জনসাধারণ যাতায়াত করেন। বিশেষ করে বর্ষাকালে কাদা ও পানির কারণে শিক্ষার্থীদের চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। অনেক সময় পা পিছলে পড়ে গিয়ে তাদের পোশাক নষ্ট হয় এবং বই-খাতা ভিজে যায়। ফলে অনেক শিক্ষার্থী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে না গিয়ে বাড়িতে ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
সংস্কার কাজে অংশ নেওয়া সমাজকর্মী মো. হারুনুর রশিদ বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে এই সড়কের দুরবস্থার কারণে এলাকাবাসী ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। তাই জনগণের দুর্ভোগ কমাতে আমরা নিজেরাই স্বেচ্ছাশ্রমে সড়ক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছি।”
![]() |
স্থানীয় মুরব্বি মো. আফতাব মিয়া বলেন, “স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও বড়চেগ এলাকায় কাংখিত উন্নয়ন হয়নি। একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হওয়া সত্ত্বেও এটি এখনও কাঁচা ও চলাচলের অনুপযোগী অবস্থায় রয়েছে। হাজার হাজার মানুষের যাতায়াতের এই সড়ক দ্রুত পাকা করা প্রয়োজন।” মো. সিদ্দেক মিয়া বলেন, “বড়চেগসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ বছরের পর বছর অবহেলার শিকার। বর্ষা মৌসুমে সড়কের অবস্থা আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। জরুরি প্রয়োজনে রোগী পরিবহন করতেও সমস্যার সৃষ্টি হয়।”
এলাকাবাসী জানান, মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী (হাজী মুজিব)-এর প্রতি তাদের অনেক প্রত্যাশা রয়েছে। তারা বিশ্বাস করেন, নতুন এমপি এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। তারা দ্রুত আমরতল-দেওড়াছড়া সড়কের দক্ষিণ বড়চেগ অংশ পাকাকরণের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
স্থানীয়দের মতে, সড়কটি পাকা করা হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকা-ে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এবং দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবে হাজারো মানুষ।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ১নং রহিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সিতাংশু কর্মকার বলেন, এই জনগুরুত্বপূর্ণ সড়কটি সংস্কারে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
পবিত্র ঈদুল আজহার টানা ছুটিতে প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে পর্যটকদের ঢল লক্ষ্য করা গেছে। ঈদের তৃতীয় দিনে সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজারো পর্যটকের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে এই জাতীয় উদ্যান। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বন বিভাগ ও ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষ ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। রোববার (৩১ মে) দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা ভুলে পরিবার-পরিজন নিয়ে পর্যটকরা ভিড় করছেন লাউয়াছড়ার সবুজ অরণ্যে। বনের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া পাহাড়ি পথ আর উঁচু-নিচু টিলার মাঝে সময় কাটাতে পেরে উচ্ছ্বসিত দর্শনার্থীরা। বিশেষ করে শিশু ও তরুণ-তরুণীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত উদ্যানের মূল ফটক থেকে শুরু করে বনের ভেতরের ট্রেইলগুলোতে পর্যটকদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান সহ-ব্যবস্থাপনা নির্বাহী কমিটির সভাপতি (ভারপ্রাপ্ত) আমিনা বেগম জানান, ‘ঈদের টানা ছুটিতে পর্যটকের সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যায় । বনের পরিবেশ রক্ষা এবং পর্যটকদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে বনকর্মী ও সিপিজি সদস্যরা সার্বক্ষণিক কাজ করছেন।
![]() |
পর্যটকদের এই ব্যাপক উপস্থিতিতে চাঙা হয়ে উঠেছে স্থানীয় পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসাগুলো। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের পাশাপাশি কমলগঞ্জের নয়নাভিরাম মাধবপুর লেক, বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ, হামহাম, মশিণিপুরি পল্লী, খাসিয়াপুঞ্জি ও চা বাগানগুলোতেও পর্যটকদের ঢল নেমেছে।
এদিকে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বন বিভাগ ও ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বনের নিরবতা বজায় রাখা এবং পরিবেশ রক্ষায় পর্যটকদের প্লাস্টিক বর্জন করার জন্য বন বিভাগ ও সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির পক্ষ থেকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়।
ঈদের ছুটিতে বি-বাড়িয়া থেকে ঘুরতে আসেন লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে রাহেলা ও তার পবিবার। তারা এ প্রতিনিধিকে বলেন, পরিবারের সবাইকে নিয়ে ঘুরতে এসেছি। এখানকার প্রকৃতি খুবই সুন্দর, ঘুরতে ভাল লাগে। শুধু এই জায়গা না চা বাগানসহ মণিপুরি পল্লী দেখেছি, খুব ভালো লেগেছে। আবার যেকোনো দিন ছুটি পেলে চলে আসবো।
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা রতন কুমার দে বলেন, এখানে আসার খুব সুন্দর পরিবেশ পেলাম, এ প্রাকৃতিক পরিবেশ খুবই আনন্দদায়ক। পরিবার নিয়ে ঘুরতে খুবই ভাল লেগেছে।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের টিকেট কালেক্টর অজানা আহমেদ কামরান বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে প্রথম দুদিন পর্যটকের সংখ্যা কম ছিল। শনিবার সকাল থেকে পর্যটকের উপস্থিতি অনেক বেড়েছে। বনের পরিবেশ রক্ষা এবং পর্যটকদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে বনকর্মী ও সিপিজি সদস্যরা সার্বক্ষণিক কাজ করছেন।’
ট্যুরিস্ট পুলিশ শ্রীমঙ্গল জোনের উপ পরিদর্শক আশরাফুল আলম বলেন, ঈদের টানা ছুটিতে আগত পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি পর্যটন কেন্দ্রে ট্যুরিস্ট পুলিশ দায়িত্বে আছে। যে কোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে প্রস্তুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার কালাছড়া বনবিটে(শ্রীমঙ্গল বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের অধীনস্থ) রাতের আঁধারে অবাধে চলছে মূল্যবান গাছ কাটা ও পাচারের মহোৎসব। একটি সংঘবদ্ধ চোরাকারবারি চক্র স্থানীয় বিট কর্মকর্তার যোগসাজশে বনের সরকারি সম্পদ উজাড় করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে বনের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কালাছড়া বনবিটের দুর্গম এলাকাগুলোকে টার্গেট করে প্রতিদিন শেষ রাতে সক্রিয় হয়ে উঠছে গাছ চোর চক্র। আকাশমণি, সেগুন, আগর ও গর্জনের মতো মূল্যবান গাছ কেটে মুহূর্তের মধ্যেই খণ্ড খণ্ড করে পিকআপ, ব্যাটারীচালিত অটোরিকশা ও ভ্যানে করে পাচার করা হচ্ছে। পাহাড়ি দুর্গম রাস্তা ব্যবহার করে রাতের আঁধারে পাচার করায় অনেক সময় সাধারণ মানুষের নজরে তা আসে না।সোমবার(০১ জুন) ভোরে আকাশমনি গাছ পাচারকালে স্থানীয়রা গাছসহ ব্যাটারীচালিত অটোরিকশা আটক করে বনবিভাগের কাছে হস্তান্তর করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, রাতের বেলা বনে গাছ কাটার শব্দ পাওয়া যায়। মাঝে মাঝেই গাছ ভর্তি গাড়ি নেমে যেতে দেখা যায়। বাধা দিতে গেলে চোর চক্রের নানামুখী হুমকির সম্মুখীন হতে হয়।
![]() |
তারা অভিযোগ করে বলেন বিট কর্মকর্তা যোগদানের পর থেকে বেড়েছে গাছ পাচার। তার যোগসাজশে চোরাকারবারি চক্র প্রতিনিয়ত বনের মূলবান গাছ কেটে পাচার করছে।
গাছ কাটার এই ধারা অব্যাহত থাকলে অচিরেই কালাছড়া বনটি তার চিরচেনা রূপ হারিয়ে মরুভূমিতে পরিণত হবে। যেভাবে প্রতিনিয়ত গাছ কাটা যাচ্ছে, তাতে বন্যপ্রাণীরা তাদের বাসস্থান ও খাদ্য হারাচ্ছে। বনের ভেতরের বড় বড় গাছগুলো কেটে ফেলায় পুরো এলাকা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে কালাছড়া বনবিট কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম নাঈম এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান,গাছ পাচারের সাথে আমার কোন সম্পৃক্ততা নেই, বরং আমি যোগদানের পর গাছ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ মামলা দিয়েছি।এগুলো আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হচ্ছে,এসব অপপ্রচার নিয়েই আামাদের চাকুরি করতে হয়।তিনি জানান, ভোরে গাছ পাচারের সময় গাছসহ একটি ব্যাটারীচালিত অটোরিকশা আটক করা হয়, এ বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
শ্রীমঙ্গল বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক জানান,নির্দিষ্ট কোন অভিযোগ থাকলে বা গাছ পাচারের সাথে বনবিভাগের কেউ জড়িত থাকলে তদন্ত করে জড়িত পাওয়া গেলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা নেবে।তবে বন বিভাগ গাছ চুরি রোধে নিয়মিত টহল পরিচালনা করছে।রাতের আঁধারে গাছ কাটার সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া আজ ভোরে গাছসহ একটি ব্যাটারীচালিত অটোরিকশা আটক করা হয়েছে, এ বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।