শেখ হাসিনা ভারতে বন্দী নন্ এ যেমন সত্য তেমনি তাঁকে যদি বাংলাদেশ ফিরিয়ে আনতে চায় কিংবা তিনি যদি নিজে নিজেই ফিরে আসতে চান তা’হলেও তাঁকে আইনী প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে আসতে হবে।
বিষয়টি আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা বা বাংলায় অনূদিত শব্দ “বন্দি বিনিময়” শোনার পর মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, কেবল কোনো কারাগারে বন্দি থাকা ব্যক্তিকেই হয়তো এই চুক্তির মাধ্যমে হস্তান্তরিত করা হয়।
তবে আইনি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিজ্ঞানের ভাষায় বিষয়টি একটু আলাদা। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. ‘বন্দি বিনিময়’ বনাম ‘Extradition’ (প্রত্যর্পণ)
বাংলায় সুবিধার্থে এটিকে প্রায়শই “বন্দি বিনিময় চুক্তি” বলা হলেও, এর সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ আইনি বাংলা পরিভাষা হলো “অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তি” (Extradition Treaty)।
শব্দগত পার্থক্য: আইনি পরিভাষায় Extradition বলতে বোঝায়—কোনো দেশে পলাতক বা অবস্থানরত অভিযুক্ত/দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে বিচার বা সাজা কার্যকর করার উদ্দেশ্যে তার নিজ দেশে হস্তান্তর করা।
ব্যক্তির বর্তমান আইনি অবস্থা (তিনি ভারতের কারাগারে বন্দি আছেন, নাকি অতিথি হিসেবে আছেন, নাকি স্বাধীনভাবে বাস করছেন) এখানে মুখ্য নয়। মুখ্য বিষয় হলো—তিনি অন্য কোনো দেশের আদালতে বিচারপ্রার্থী বা দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি কি না।
২. চুক্তিটি কেন প্রযোজ্য হবে?
শেখ হাসিনা ভারতে কোনো কারাগারে বন্দি নন এবং তিনি সেখানে ভারতের সরকারের আশ্রয়ে/অতিথি হিসেবে আছেন—এটি সত্য। কিন্তু বাংলাদেশে যদি তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা বিচারাধীন অভিযোগ থাকে, তবে আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো অনুযায়ী তাঁকেও বাংলাদেশ সরকারের হাতে তুলে দিতে হলে এই Extradition Treaty (২০১৩ এবং ২০১৬-এর সংশোধনী)-র মাধ্যমেই অনুরোধ পাঠাতে হবে।
চুক্তিটির মূল উদ্দেশ্য হলো:
1. অভিযুক্তকে ফেরত আনা: যার বিরুদ্ধে এক দেশে অপরাধ বা মামলার অভিযোগ রয়েছে কিন্তু তিনি অন্য দেশে অবস্থান করছেন।
2. দণ্ডপ্রাপ্তকে ফেরত আনা: যার বিচারে সাজা হয়েছে এবং তিনি অন্য দেশে পালিয়ে বা অবস্থান করছেন।
ফলে, আশ্রয়ে বা অবাধ বিচরণে থাকলেও অন্য দেশের অনুরোধের ভিত্তিতে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করতে এই চুক্তিটিই একমাত্র মাধ্যম।
৩. ভারতের হাতে কি তাঁকে ফেরত না দেওয়ার কোনো সুযোগ আছে?
চুক্তির বিধান অনুযায়ী, কোনো দেশের অনুরোধ পেলেই যে অন্য দেশ সরাসরি আসামিকে দিয়ে দেবে তা নয়। চুক্তির শর্তে কিছু ব্যতিক্রম ও রাজনৈতিক ছাড়ের সুযোগ থাকে:
রাজনৈতিক চরিত্রের অপরাধ (Political Exception): চুক্তিতে বলা আছে, অপরাধটি যদি রাজনৈতিক স্বভাবের হয়, তবে অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে।
সুবিচার ও মানবাধিকার সংক্রান্ত শর্ত: যদি অনুরোধ প্রদানকারী দেশ অনুরোধটি ন্যায়বিচারের স্বার্থে বা “স্বচ্ছ উদ্দেশ্যে” (Good Faith) না করে থাকে, তবে অন্য দেশ তা প্রত্যাখ্যান করার অধিকার রাখে।
সহজ কথায়, ‘বন্দি বিনিময় চুক্তি’ নাম হলেও এটি মূলত ‘পলাতক অপরাধী হস্তান্তরের আন্তর্জাতিক আইনি পথ’। কোনো ব্যক্তি বিদেশি ভূমিতে স্বাধীনভাবে থাকুন কিংবা জেলে থাকুন, তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত চাইতে হলে এই আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়েই যেতে হয়।