দেশোয়ালি সমাজের ‘মিলনমেলা ২০২৬’
অনুষ্ঠিত হলো মৌলবীবাজারে
”চলো এক হই, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে লালন করি, উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলি” এই প্রতিপাদ্য বিষয়কে সামনে রেখে প্রথমবারের মতো মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে অত্যন্ত আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশে গতকাল অনুষ্ঠিত হয় ‘দেশোয়ালি সমাজ মিলনমেলা ও আলোচনা সভা২০২৬’।
শ্রীমঙ্গলস্থ জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এই ব্যতিক্রমধর্মী ও বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে মৌলভীবাজার, শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, রাজনগর এবং সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত দেশোয়ালি জনগোষ্ঠীর শত শত নারী, পুরুষ, শিক্ষার্থী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অংশ নেন। দীর্ঘ দিন পর একে অপরের সংস্পর্শে এসে পুরো অডিটোরিয়াম প্রাঙ্গণ এক আবেগঘন ও মিলনমেলায় পরিণত হয়।
দেশোয়ালি সমাজের বয়োজ্যেষ্ঠ অভিভাবক ও মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের সাবেক অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক কৃষ্ণলাল কালোয়ারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট প্রসূতি ও গাইনি বিশেষজ্ঞ সার্জন ডা. সুধাকর কৈরী।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা রাজেন কৈরী। তিনি তাঁর বক্তব্যে মিলনমেলার মূল উদ্দেশ্য তুলে ধরে বলেন, “দেশোয়ালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক পরিচিতি, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সামাজিক ঐক্য আরও সুদৃঢ় করাই এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য। দেশোয়ালি সমাজ বাংলাদেশের একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী হলেও শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে আমাদের নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে হবে। নতুন প্রজন্মকে শিক্ষিত ও আদর্শবান নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে আমাদের সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।”
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিশিষ্ট প্রসূতি ও গাইনি বিশেষজ্ঞ সার্জন ডা. সুধাকর কৈরী বলেন, “এই সমাজের সকলকে সর্বাবস্থায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। আমাদের নিজেদের অধিকার, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।” সমাজের অভিভাবক হিসেবে সবাইকে আশ্বস্ত করে তিনি আরও বলেন, “আপনাদের যেকোনো প্রয়োজনে, যেকোনো সমস্যায় পড়লে সরাসরি আমাকে জানাবেন। আমি সাধ্যমতো আপনাদের পাশে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।”
অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন প্রকাশ ভর, সজল কৈরী এবং বিজয় নুনিয়া। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন রাজনগর সরকারি কলেজের প্রভাষক সঞ্জিত যাদব, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান রামভজন কৈরী, মাধবপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান পুষ্প কুমার কানু, বাংলাদেশ চা শ্রমিক কমিউনিটির প্রথম নারী গ্র্যাজুয়েট সারদা গোয়ালা, বাংলাদেশ দেশোয়ালি সমাজ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক উজ্জ্বল প্রসাদ কানু, বাংলাদেশ দেশোয়ালি সমাজের সহ-সাধারণ সম্পাদক সংযুক্তা দুবে।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন পরাগ বারই, মিলন শীল, ইউপি চেয়ারম্যান প্রানেশ গোয়ালা এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জয়প্রকাশ কৈরীসহ সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
আলোচনা সভায় সমাজের বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, সমাজের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি যেন আরও কয়েকজনকে প্রতিষ্ঠিত করতে এগিয়ে আসেন। দরিদ্র শিক্ষার্থী ও অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।
সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ৫টি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করা হয়:
১. সকল দেশোয়ালি জনগোষ্ঠীকে একটি সাধারণ প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ করা।
২. পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং সামাজিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করা।
৩. সমাজের গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় সহায়তা প্রদান।
৪. অসহায় ও দরিদ্র পরিবারের কন্যাদের বিয়েতে আর্থিক ও সামাজিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া ও
৫. সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলা।
সভায় অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ কানু সমাজের সাধারণ সম্পাদক নির্মল কানু, জেনারেল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের স্বত্বাধিকারী অশোক পাশী, সাবেক স্বাস্থ্য পরিদর্শক দিলীপ কুমার কৈরী, ছাত্র প্রতিনিধি শুভ কৈরী, হৃত্তিক রাম যাদবসহ লোহার, তেলী, পাশী, যাদব, ছত্রী ও বারই জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা।
আলোচনা সভায় মিলনমেলার অন্যতম আকর্ষণ মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। লক্ষ্মীনারায়ণ পাশী ও তাঁর দলের পরিচালনায় এবং সারদা গোয়ালার বিশেষ পরিবেশনায় ভোজপুরী ভাষাভিত্তিক গান, লোকসংগীত ও ঐতিহ্যবাহী নৃত্য পরিবেশিত হয়। ঐতিহ্যবাহী সুর ও ছন্দে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো অডিটোরিয়াম।
ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে আরও সুদৃঢ়? করার প্রত্যয় এবং “ঐক্যই শক্তি” এই বিশ্বাসকে বুকে ধারণ করে এক অনন্য বার্তা নিয়ে শেষ হয় দেশোয়ালি সমাজের এই মিলনমেলা ২০২৬।
উপস্থিত সকলেই প্রতি বছর এই ধরনের আয়োজন বজায় রাখার দাবী জানান।
নির্ঝর মেধা নির্বচনী পরিক্ষার পুরস্কার বিতরণ
’নির্ঝর মেধা প্রকল্প’ মৌলভীবাজারের আয়োজনে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের এম সাইফুর রহমান অডিটোরিয়াম অনুষ্ঠিত হয় নির্ঝর মেধা নির্বচনী পরিক্ষার পুরস্কার বিতরণ।
শনিবার সকাল ১১ ঘটিকার সময়, নির্ঝর মেধা প্রকল্পের আয়োজনে ৩৫ তম মেধা নির্বাচনী পরিক্ষার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন, সিলেট শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, আনোয়ার হোসেন চৌধুরী।
নির্ঝর এর কার্ষকরী কমিটির সদস্য সৈয়দা এহসানা রহমান এর সঞ্চালনায় ও প্রফেসর মোঃ সেলিম এর সভাপতিত্বে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত ও গীতা পাঠের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। স্বাগত বক্তব্য দেন অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন।
প্রধান অতিথি তার বক্তব্যে বলেন, শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করার জন্যই এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এর ফলে মেধা যাচাই পরিক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত মেধাবীরা বেরিয়ে আসে।
![]() |
![]() |
তিনি বলেন, বতর্মান সরকার শিক্ষা ক্ষেত্রে দুর্নীতি দুর করতে বদ্ধপরিকর। শিক্ষার মান যাতে সঠিক থাকে সে দিকে বর্তমান সরকার সচেষ্ট রয়েছে। তিনি একটি উদাহর দিয়ে বলেন, এক সময় সিলেট শিক্ষা বোর্ডের পরিক্ষার খাতা বিষয় ভিত্তিক শিক্ষক দ্বারা ঠিক সেই বিষয়ের খাতা মূল্যায় করা হতো না তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এই অনিয়ম দূর করেছেন। তিনি আরও বলেন, সিলেট শিক্ষা বোর্ডের সব কিছু অনলাইন ভিত্তিক, এখন আর কোনো শিক্ষার্থীকে কষ্ট করে বোর্ডে আসতে হবে না। তিনি মেধাবী শিক্ষার্থীদের উজ্জ্বল ভবিষ্যত কামনা করেন এবং নির্ঝরের প্রতি অসংখ্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
এছাড়াও আরও বক্তব্য প্রদান করেন, শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সৈয়দ মোঃ মহসিন, নির্ঝর কার্ষকরী কমিটির সদস্য প্রফেসর রফি আহমদ চৌধুরী, মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তুলসি রানী সরকার, নির্ঝর দাতা সদস্য প্রবাসী মোস্তাক আহমদ অপু, নির্ঝর কার্ষকরী কমিটির যুগ্ম সম্পাদক মান্নান আহমদ, আলী আমজদ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক মুজিবুর রহমান, শাহ হেলাল উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা দেন, আব্দুর রহমান শাহী, তাহসিন নোজহাত প্রমূখ।
উল্লেখ্য, গত ডিসেম্বরের অনুষ্ঠিত নির্ঝর মেধা নির্বাচনী পরিক্ষায় প্রাইমারি ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ২১৬টি বিদ্যালয় থেকে মোট ২৮৮২ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহন করে। এর মধ্যে পরিক্ষায় ভালো ফলাফল করে ৯৬ জন শিক্ষার্থী। অনুষ্ঠানের শেষ অংশে মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্রেষ্ট ও সার্টিফিকেট বিতরণ করা হয়।