“রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র:
|
গত এক সকালে আমার মুক্তিযুদ্ধের সতীর্থ বাল্যবন্ধু সৈয়দ নাসিরের সাথে দূরালাপণীতে গল্প করছিলাম। আলাপচারিতায় তার পাঠানো রাষ্ট্রের বহুমাত্রিক রূপের এক ‘পাঁচ রাষ্ট্র’ তত্ত্ব সামনে আসে। এটি শুনতে যতটা নাটকীয়, এর ভেতরে লুকানো রাজনৈতিক সত্যটা ততটাই ভাবনার অবস্থানকে প্রসারিত করে।
নাসির ইমেইল মাধ্যমে আমাকে দেশে চলমান রাজনীতির একটি ব্যাখ্যা ফেইচবুক থেকে সংগ্রহ করে পাঠিয়েছেন। আলাপে রাষ্ট্রের বহুমাত্রিক রূপের এই ‘পাঁচ রাষ্ট্র’ তত্ত্বটি সামনে আসে। এটি শুনতে যতটা নাটকীয়, এর ভেতরে লুকানো রাজনৈতিক সত্যটা ততটাই ভাবনার অবস্থানকে প্রসারিত করে।
স্বাভাবিক কারণেই ভাল-মন্দ দু’একটি কথা বলার পর আলাপে দেশের রাজনীতির বিষয়টিই সামনে এসে যায়। তাঁর পাঠানো সেই ‘রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র’-এর বিশ্লেষণটি বেশ গভীর এবং এটি প্রচলিত রাষ্ট্রবিজ্ঞানের “ডিপ স্টেট” (Deep State) বা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সমান্তরাল ক্ষমতার কাঠামোর ধারণাকে একটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করেছেন লেখক। লেখক মূলত ক্ষমতার ভরকেন্দ্র বা প্রভাবশালী দলগুলোকে(Influential Groups) আলাদা আলাদা ‘রাষ্ট্র’ হিসেবে কল্পনা করেছেন। এমন কল্পনার কারণ লেখকই ভাল বলতে পারবেন।
তাঁর এ বক্তব্য সম্পূর্ণ সঠিক নাকি আংশিক—তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নানা মত রয়েছে। তবে একজন লেখক ও সাংবাদিক হিসেবে আমি তাঁর এই পাঁচটি পয়েন্টকে বাস্তব প্রেক্ষাপটে যদি একটু চুলচেরা বিশ্লেষণ করি, তবে বিষয়টি এমন দাঁড়ায়:-
১. আর্মি রাষ্ট্র (The Military-Institutional Influence)
বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে একটি গণপ্রজাতন্ত্রী, স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র, যার শাসনব্যবস্থা বেসামরিক সংবিধানের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের ইতিহাসে সামরিক শাসনের একটি দীর্ঘ অধ্যায় রয়েছে এবং রাজনীতিতে বা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে সামরিক বেসামরিক সম্পর্কের প্রভাব নিয়ে সবসময়ই আলোচনা হয়। তবে একে পুরোপুরি আলাদা ‘রাষ্ট্র’ বলার চেয়ে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের ওপর তাদের বিশেষ প্রভাব হিসেবে দেখাটাই বেশি যুক্তিযুক্ত।
সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতা জনগণের হাতে এবং সামরিক বাহিনী বেসামরিক প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে।
দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান মূলত গণতান্ত্রিক বা বেসামরিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হয়ে থাকেন।
গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন: ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর থেকে সামরিক বাহিনী মূলত বেসামরিক সরকারের অধীনে থেকে পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করছে।
সামরিক অভ্যুত্থানের ইতিহাস: ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে এবং দেশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সামরিক শাসনের অধীনে ছিল।
গ. বেসামরিক প্রশাসনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা
জাতীয় সংকট, তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতা বা অভ্যন্তরীণ জরুরি পরিস্থিতিতে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য (Aid to Civil Power) সেনাবাহিনীকে প্রায়ই দায়িত্ব দেওয়া হয়।
দেশের বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সেনাবাহিনী সরাসরি অংশ নেয়।
ঘ. বৈশ্বিক ভাবমূর্তি
জাতিসংঘ শান্তিমিশন: আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে সর্বোচ্চ অবদানকারী দেশগুলোর একটি হিসেবে অত্যন্ত সুনাম অর্জন করেছে।
২. আমলা রাষ্ট্র (The Bureaucratic State)
এ কথাটির সাথে বর্তমান অনেক বিশ্লেষকই একমত হবেন। বলা হয়ে থাকে, ইদানীংকালে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের চেয়ে প্রশাসনের উচ্চপদস্থ আমলাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রেই বেশি দৃশ্যমান। নীতি নির্ধারণ থেকে শুরু করে মাঠ প্রশাসন—সবখানেই আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ এতটাই জোরালো যে সাধারণ মানুষের মনে হতেই পারে রাষ্ট্রটি আমলারা চালাচ্ছেন।
বাংলাদেশকে আংশিকভাবে “আমলা রাষ্ট্র” বা Bureaucratic State বলা চলে। তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে রাষ্ট্রটি আমলাতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য ও আধিপত্য প্রদর্শন করে, যেখানে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নে রাজনীতিবিদদের চেয়ে অরাজনৈতিক সরকারি কর্মকর্তাদের প্রভাব বেশি থাকে।
ঔপনিবেশিক ঐতিহ্য: বাংলাদেশের আমলাতান্ত্রিক কাঠামো মূলত ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যেখানে প্রশাসন সাধারণ জনগণের সেবক হিসেবে নয়, বরং শাসক হিসেবে কাজ করতে অভ্যস্ত।
অতীতে বিভিন্ন সময়ে দীর্ঘ সামরিক শাসন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্বের কারণে রাজনীতিবিদদের ওপর আমলাদের নির্ভরতা বেড়েছে। অনেক সময় রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থে প্রশাসনকে ব্যবহার করায় আমলারা ক্ষমতার মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হন।
![]() |
রাষ্ট্রের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, বাজেট প্রণয়ন ও বড় বড় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে আমলারা প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেন। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিদের তুলনায় বিশেষজ্ঞদের ও আমলাদের মতামত বেশি প্রাধান্য পায়।
আমলাতন্ত্রের জটিল প্রক্রিয়া ও কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার কারণে প্রায়শই সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
তবে সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, যেখানে চূড়ান্ত ক্ষমতা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে থাকার কথা। তাই তাত্ত্বিকভাবে এটিকে পুরোপুরি ‘আমলাতন্ত্র’ না বলে, রাজনীতিক ও আমলাদের একটি মিশ্র বা যৌথ শাসন হিসেবে গণ্য করা হয়, তবে আমলাদের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলকভাবে প্রবল এটি স্বীকার্য্য।
৩. রাজনৈতিক-ব্যবসায়ী শ্রেণীর রাষ্ট্র(The Oligarchy / Crony Capitalism)এটি অত্যন্ত শক্তিশালী একটি পর্যবেক্ষণ। বর্তমান বাংলাদেশে রাজনীতি এবং ব্যবসা একাকার হয়ে গেছে। পার্লামেন্টের সিংহভাগ সদস্যই ব্যবসায়ী। বাংলাদেশকে নির্দ্বিধায় একটি রাজনৈতিক-ব্যবসায়ী শ্রেণীর রাষ্ট্র বা ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ (Crony Capitalism)-এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ বলা চলে। যখন ব্যবসায়ীরাই আইনপ্রণেতা হন, তখন পলিসি বা নীতিগুলো সাধারণ মানুষের চেয়ে কর্পোরেট বা ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থে বেশি তৈরি হয়। একে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বৈদেশিক ভাষায় ‘অলিগার্কি’ বলা যায়।
সমাজবিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণে, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে রাষ্ট্রক্ষমতা ও অর্থনীতির চাবিকাঠি প্রায় পুরোপুরি একটি পারস্পরিক নির্ভরশীল গোষ্ঠীর হাতে কুক্ষিগত হয়েছে।
জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার পর্যন্ত সব পর্যায়েই ব্যবসায়ীদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিভিন্ন সরকারের আমলে জাতীয় সংসদে ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ সদস্যই ব্যবসায়ী পেশার প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ফলে আইন প্রণয়ন ও নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং ব্যক্তিমুনাফার বিষয়টি জনস্বার্থের চেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।
খ. স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest): যাঁরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আছেন বা নীতিনির্ধারণ করছেন, তাঁরা নিজেরাই ব্যাংক, বীমা, রিয়েল এস্টেট ও আমদানি-রপ্তানি ব্যবসার সাথে যুক্ত। এর ফলে রাষ্ট্রীয় নীতি, কর সুবিধা এবং ব্যাংক ঋণ বরাদ্দের ক্ষেত্রে সবসময় একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর স্বার্থ সংরক্ষিত হয়েছে।
জামাতের রাষ্ট্র বলেও অনেকে বলে থাকেন। জামাতের রাষ্ট্র বলে যারা উল্লেখ করেন তারা হয়তো এখানে একটি নির্দিষ্ট আদর্শিক গোষ্ঠীর কথা বলতে চান, যারা মূল ধারার রাজনীতির বাইরেও নিজস্ব অর্থনৈতিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক (যেমন শিক্ষা, ব্যাংক, এনজিও ইত্যাদি) একটি সমান্তরাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। তবে একে পুরো ‘রাষ্ট্র’ না বলে একটি ‘সংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী’ (Organized Pressure Group) বলা চলে।
সুতরাং, বাংলাদেশকে এককভাবে কোনো নির্দিষ্ট আদর্শিক দলের রাষ্ট্র না বলে বরং বিভিন্ন মতাদর্শ—যেমন ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ এবং ইসলামপন্থা—এর মধ্যকার একটি আদর্শিক ক্ষমতার লড়াইয়ের ক্ষেত্র বলা যায়। জামায়াতে ইসলামী এই রাজনৈতিক সমীকরণে অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
৫. প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমান্তরাল উপ-সংস্কৃতির রাষ্ট্র (The Parallel Sub-culture of the Marginalized)
এ চিন্তাটি খুব মানবিক এবং বেদনাকাতর। সহজ ভাষায় এর মূল ধারণাটি হলো: সমাজে যাদের সুবিধাবঞ্চিত বা প্রান্তিক হিসেবে দেখা হয় (যেমন—শ্রমিক, বস্তিবাসী, ভাসমান মানুষ, আদিবাসী বা দলিত সম্প্রদায়), তারা মূলধারার সংস্কৃতির পাশাপাশি নিজেদের টিকে থাকার সংগ্রাম ও জীবনবোধ থেকে নিজস্ব যে ভাষা, শিল্প, সংগীত ও জীবনযাপনের ধরন তৈরি করে, সেটাই হলো এই সমান্তরাল সংস্কৃতি।
দেশের সিংহভাগ সাধারণ মানুষ, যারা দিন আনে দিন খায়, তারা আসলে মূল ধারার ক্ষমতার ভাগীদার নয়। তাদের জীবন চলে নিজেদের নিয়মে, যেখানে রাষ্ট্রের আইনি বা অর্থনৈতিক সুরক্ষা খুব কমই পৌঁছায়। এটা আসলে বৈষম্যের শিকার ‘বঞ্চিতদের এক বিশাল জগত’, যা মূল রাষ্ট্রের ভেতরেই আরেকটা অদৃশ্য জগত হয়ে আছে।