সার্বভৌমত্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ: আসলেই কি বাংলাদেশ এক অদ্ভুত দোদুল্যমান অবস্থায় |
|
হরমুজ প্রণালীর উত্তাল জলরাশির মাঝে আটকে আছে বাংলাদেশের সারবাহী জাহাজ। ঠিক একইভাবে, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণে আজ যেন আটকে পড়েছে আমাদের দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ। একদিকে আমেরিকার সাথে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের করা সেই রহস্যময় ও অসম চুক্তি, যা আমাদের স্বাধীনভাবে পণ্য কেনার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে; অন্যদিকে জ্বালানি ও সার সংকটের মুখে বেইজিংয়ে সাহায্যের হাত বাড়ানো—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ আজ এক অদ্ভুত দোদুল্যমান অবস্থায়। অসাম্য চুক্তির শৃঙ্খল: আমাদের অর্থনীতির চাবি কি অন্যের হাতে?বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমেরিকার সাথে যে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করেছে, তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি ‘কৌশলগত ফাঁদ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ববাজারে সুলভ মূল্যে পণ্য পাওয়ার বিকল্প উৎস থাকা সত্ত্বেও কেন আমাদের একটি নির্দিষ্ট দেশের ‘অনুমতি’ নিয়ে ব্যবসা করতে হবে? একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে অপমানজনক শর্ত আর কী হতে পারে? এই শর্তটি কার্যত আমাদের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বকে খর্ব করেছে। প্রশ্ন উঠছে, যে চুক্তির কারণে আমাদের শিল্প ও কৃষি আজ সংকটের মুখে, সেই চুক্তির ধারাগুলো কেন এখনও জনগণের সামনে উন্মোচিত করা হলো না? নির্বিকার সরকার ও দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সংকটফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিপুল জনসমর্থন (২/৩ সংখ্যাগরিষ্ঠতা) নিয়ে ক্ষমতায় আসা বর্তমান সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। সরকার এখন সাংবিধানিকভাবে যেকোনো ভুল সংশোধন করার পূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু সরকার যেন এ বিষয়ে নির্বিকার। তারা কি আন্তর্জাতিক মহলের অসন্তোষের ভয়ে জনগণের স্বার্থকে বিসর্জন দিচ্ছে? মনে রাখতে হবে, ২/৩ সংখ্যাগরিষ্ঠতা কেবল ক্ষমতার দাপট দেখানোর জন্য নয়, বরং তা জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য। সরকারের এই নীরবতা কেবল সাধারণ মানুষের মধ্যে সংশয়ই বাড়াচ্ছে না, বরং এটি আমাদের বাজারের চাবিকে পরনির্ভরশীল করে তুলছে। ভূ-রাজনৈতিক দাবার বোর্ড ও আমাদের ভবিষ্যৎ
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাম্প্রতিক চীন সফর নতুন করে জল্পনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে করা অসম চুক্তির দায়ভার, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজের জট—বাংলাদেশ যেন এখন ভূ-রাজনীতির এক ভয়াবহ গোলকধাঁধায়। চীন কি পারবে আমাদের জ্বালানি বা সার সরবরাহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে? নাকি বেইজিংয়ের সাহায্য আমাদের বৈদেশিক ঋণের বোঝাকে আরও ভারী করবে? যখন একটি দেশ একদিকে আমেরিকার শর্ত মেনে চলে এবং অন্যদিকে চীনের কাছে সাহায্যের প্রত্যাশা করে, তখন সেই পররাষ্ট্রনীতিকে ‘ভারসাম্য’ বলা যায় না; একে বলা হয় পররাষ্ট্রনীতির অস্থিরতা। সরকারের প্রতি আমাদের প্রশ্ন ও প্রত্যাশাআমরা কি তবে কোনো হাইব্রিড সার্বভৌমত্বে বাস করছি? আমাদের সরকার কি সত্যিই এমন এক সংকটে পড়েছে যেখানে তারা এক শক্তির কাছে মাথা নত না করে অন্য শক্তির কাছে হাত পাততে বাধ্য হচ্ছে? বিদেশের তুষ্টি অর্জন ক্ষমতা পেতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে হলে দেশের মানুষের পেটে খাবার পৌঁছাতে হবে। সরকারের প্রতি আমাদের জোরালো আহ্বান:১. অবিলম্বে সেই বিতর্কিত চুক্তির ‘শ্বেতপত্র’ (White Paper) প্রকাশ করুন। ২. জাতীয় স্বার্থবিরোধী শর্তগুলো সংশোধন করতে সাহসী কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করুন। ৩. ভূ-রাজনৈতিক দাবার বোর্ডে ঘুঁটি না হয়ে, দেশীয় উৎপাদন ও সাশ্রয়ী বাজার অনুসন্ধানে জোর দিন। মনে রাখবেন, ইতিহাসের শিক্ষা হলো—যে সরকার বিদেশের ওপর অতি-নির্ভরশীল হয়ে নিজের বাজারের চাবি অন্যের হাতে তুলে দেয়, তারা শেষ পর্যন্ত না পায় বিদেশের অকৃত্রিম বন্ধুত্ব, না পায় দেশের মানুষের আস্থা। বিশাল জনসমর্থন পাওয়া এই সরকারের এখনই সময় নিজের অবস্থানে অটল হওয়া। সময় ফুরিয়ে আসছে, আর জনগণ সব দেখছে। |