প্রবাসে থাকা বাংলাদেশিদের সাফল্যগাথা
রুশনারা আলী :-
বৃটিশ সংসদ সদস্য ও প্রাক্তন শিক্ষা মন্ত্রী-
প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ হিসেবে রুশনারা আলী প্রথম ২০১০ সালে টাওয়ার হ্যামলেটসের বেথনালগ্রিন অ্যান্ড বো আসন থেকে পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন। ওই আসন থেকে তিনি টানা চারবার পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন। এবারও তিনি বেথনালগ্রিন অ্যান্ড স্টেপনি আসন থেকে ১৫ হাজার ৮৯৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। সব মিলিয়ে তিনি টানা পাঁচবার সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
রুশনারা আলী লেবার পার্টির এই আসনে একদশক ধরে বিজয়ী হয়ে আসছেন। এদিকে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীও আরেক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ স্বতন্ত্র প্রার্থী আজমল মাশরুর।
রুশনারা আলী ২০১০সাল থেকে আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক ছায়ামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। এরপর তিনি ২০১৩ সালের অক্টোবরে ছায়া শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত হন। এবার মন্ত্রীসভা থেকে তিনি সরে আসেন।
রুশনারা আলীর জন্ম পুরোনো সিলেট জেলায়। তার বয়স যখন সাত বছর, তখন পরিবারের সাথে যুক্তরাজ্যে আসেন। তিনি অক্সফোর্ডের সেন্ট জনস কলেজ থেকে দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন।
রূপা হক:-
বৃটিশ সংসদ সদস্য
রুপা হক, বৃটিশ সংসদ সদস্য, বাংলাদেশের পাবনার কন্যা; একজন বিশিষ্ট ব্রিটিশ-বাংলাদেশি রাজনীতিক। তিনি যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির সদস্য এবং লন্ডনের ইলিং সেন্ট্রাল ও অ্যাকটন আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য। একজন জ্ঞানীপণ্ডিত, লেখক এবং সমাজতাত্ত্বিক হিসেবে তার বহুমূখী পরিচিতি রয়েছে।
প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষা
রুপা হক ১৯৭২ সালে লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মাতা বাংলাদেশের পাবনা থেকে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান ১৯৬০-এর দশকে। রুপার শিক্ষাজীবন শুরু হয় স্থানীয় বিদ্যালয়ে, পরে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন, যেখানে তিনি সমাজতত্ত্ব বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি কিংস্টন ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা শুরু করেন। গবেষণা এবং একাডেমিক কাজের পাশাপাশি তিনি লেখালেখির জগতে প্রবেশ করেন এবং বেশ কিছু প্রবন্ধ ও বই রচনা করেন। তার লেখাগুলোতে অভিবাসন, সংস্কৃতি এবং সমাজের নানা দিক উঠে আসে।
রুপা হকের বাবা-মা তাকে সবসময় শিক্ষার প্রতি মনোযোগী হতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। পরিবার থেকে প্রাপ্ত মূল্যবোধই তাকে একটি আন্তর্জাতিক পরিচিতি অর্জনে সহায়তা করেছে। ছোটবেলা থেকেই সমাজের অসাম্যতার দিকে তার নজর ছিল, যা তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ জ্ঞানান্বেষী অনুশীলিত জীবনের ভিত্তি স্থাপন করে।
রাজনৈতিক যাত্রা
রুপা হকের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় স্থানীয় রাজনীতি থেকে। ২০১৫ সালে তিনি প্রথমবারের মতো ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি তার নির্বাচনী এলাকা ইলিং সেন্ট্রাল ও অ্যাকটনের বাসিন্দাদের জন্য কাজ করে প্রশংসিত হন। তার এই বিজয় শুধু তার নয়, পুরো ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য একটি বড় অর্জন ছিল।
তার প্রধান এজেন্ডাগুলোর মধ্যে রয়েছে সামাজিক ন্যায়বিচার, লিঙ্গ সমতা এবং পরিবেশ রক্ষা। তার নেতৃত্বে স্থানীয় বাসস্থান সমস্যা সমাধান, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এবং শিক্ষার মান বৃদ্ধি নিয়ে কাজ হয়েছে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে একজন অভিবাসী পরিবারের সন্তান হয়েও ব্রিটিশ মূলধারার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব।
টিউলিপ সিদ্দীকি:-
বৃটিশ সংসদ সদস্য ও প্রাক্তন নগর মন্ত্রী
টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিক (জন্ম: ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮২) একজন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেবার পার্টি এবং কো-অপারেটিভ পার্টির রাজনীতিক। তিনি ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে লন্ডনের হ্যামস্টেড অ্যান্ড কিলবার্ন আসন থেকে পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এর পূর্বে তিনি রিজেন্ট পার্কের কাউন্সিলর এবং ২০১০ সালে ক্যামডেন কাউন্সিলের কালচার অ্যান্ড কমিউনিটির সদস্য ছিলেন।
তিনি ট্রেজারির অর্থনৈতিক সেক্রেটারি এবং সিটি মন্ত্রী হিসেবে ৯ জুলাই ২০২৪ থেকে ১৪ জানুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন।
বাংলাদেশে রাজনীতিতে অধুনা বিস্ময়কর পরিবর্তনের ধারায় তার বিরুদ্ধে মামলা হলে তিনি স্বেচ্ছায় বৃটিশ নগরমন্ত্রীর দায়ীত্ব থেকে অব্যাহতি নেন। বর্তমানে ওই মামলায় তার সাজাও হয়েছে!
আপসানা বেগম:-
বৃটিশ সংসদ সদস্য
যুক্তরাজ্যের লন্ডনে বাংলাদেশি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটসের পপলার অ্যান্ড লাইমহাউস আসন থেকে লেবার পার্টির মনোনয়নে দ্বিতীয়বারের মতো পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন আপসানা বেগম। তিনি পেয়েছেন ১৮ হাজার ৫৩৫ ভোট। তার নিকটতম প্রার্থী গ্রিন পার্টির নাথালি বেইনফিট পেয়েছেন মাত্র ৫ হাজার ৯৭৫ ভোট। আপসানার এই আসন নিয়ে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে বেশি আলোচনা ছিল তার সাবেক স্বামীর কারণে। তবে আপসানার সাবেক স্বামী এহতেশামুল হক স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ৪ হাজার ৫৫৪ ভোট পেয়ে চতুর্থ স্থান পেয়েছিলেন।
 |
২০১৯ সালে আপসানা লেবার পার্টির মনোনয়নে প্রথম পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন। ওয়েস্টমিনস্টার পার্লামেন্টে তিনিই প্রথম হিজাব পরিহিত সংসদ সদস্য ছিলেন। ফিলিস্তিনের গাজায় চলমান ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রতিবাদে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সোচ্চার ভূমিকা পালন এবং গাজায় যুদ্ধবিরতির পক্ষে ভোট দিয়ে ব্যাপক আলোচনায় আসেন তিনি। আপসানার জন্মস্থান ও বেড়ে ওঠা টাওয়ার হ্যামলেটসেই। তার বাবা টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের সাবেক কাউন্সিলর মনির উদ্দিন আহমেদ। বাংলাদেশে তাদের আদি বাড়ি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলায়। রাজনীতি বিষয়ে কুইনমেরি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১১ সালে স্নাতক এবং ২০১২ সালে সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন ও কমিউনিটি লিডারশিপ বিষয়ে তিনি পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন।
আফসানা বেগমের পূর্বপুরুষেরা থাকতেন অধুনা বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুরে। তার বাবা তার বাবা মনির উদ্দিন টাওয়ার হ্যামলেটসের সিভিক মেয়র ছিলেন। তিনি ছিলেন জগন্নাথপুর পৌরসভার লুদুরপুর এলাকার বাসিন্দা। তবে আপসানা বেগমের জন্ম ও বেড়ে ওঠা লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসে। তিনি লেবার পার্টির লন্ডন রিজিয়ন শাখার সদস্য। দলটির টাওয়ার হ্যামলেটস শাখার সহসভাপতিরও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। তিনি টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের আবাসন বিভাগে কর্মরত আছেন।
পপলার এবং লাইম হাউস সংসদীয় আসনের সাংসদ জিম ফিটজপেট্রিক ২০১৯ সালের শুরুর দিকে রাজনীতি থেকে অবসরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে, ২০১৯ সালের ব্রিটিশ সংসদ নির্বাচনে এ আসনে লেবার পার্টির মনোনয়ন পান আপসানা বেগম। নির্বাচনে তিনি ৩৮,৬৬০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কনজারভেটিভ পার্টির শন ওক ওই সময় পেয়েছিলেন ৯,৭৫৬ ভোট।
লুৎফর রহমান
লুৎফুর রহমান একজন সমাজকর্মী ও যুক্তরাজ্যের লন্ডনের একজন স্থানীয় রাজনীতিবিদ। তিনি বর্তমানে লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেট পৌর অঞ্চলের মেয়র। ২০১০ সালে তিনি মেয়র নির্বাচিত হন এবং তিনি এই অঞ্চলের ইতিহাসে প্রথম সরাসরি ভোটে নির্বাচিত মেয়র। মেয়র নির্বাচনের আগ পর্যন্ত তিনি একই অঞ্চলের পৌর পরিষদের নির্বাচিত প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার জন্ম বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে। তার খুব কম বয়সে তার পিতা সপরিবারে যুক্তরাজ্যে আসেন ও লন্ডনে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
আনোয়ার চৌধুরী
ব্রিটিশ বাংলাদেশী কূটনীতিক।
ব্রিটিশ বাংলাদেশী কূটনীতিক আনোয়ার চৌধুরী, যিনি ২০০৪ সালে বাংলাদেশে বৃটিশ হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। বৃটেনের ইতিহাসে তিনিই প্রথম অশ্বেতাঙ্গ হিসেবে কূটনীতিক পদে নিয়োগ পান। তিনিই প্রথম কোন বাঙালি যিনি ব্রিটিশ হাই কমিশনার হিসেবে বাংলাদেশে দায়িত্ব পালন করেন। এর পরে বৈদেশিক ও কমনওয়েলথ অফিসে একজন ব্যবস্থাপক হিসাবে দায়িত্ব পালন শেষে বর্তমানে তিনি পেরুতে ব্রিটিশ হাই কমিশনার হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি ১৯৫৯ সালের ১৫ জুন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর থানার পাটলী ইউনিয়নের প্রভাকরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলাতেই তিনি তার বাবা মায়ের সঙ্গে লন্ডনে পাড়ি জমান। ব্যক্তিগত জীবনে আনোয়ার চৌধুরী মোমেনা চৌধুরীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তারা দুই মেয়ে এবং এক ছেলে সন্তানের জনক-জননী।
ব্যারোনেস মনজিলা পলা উদ্দিন
ব্যারোনেস মনজিলা পলা উদ্দিন। বৃটিশ লেবার পার্টির রাজনীতিক, সমাজকর্মী। বৃটেনের রাজনীতিতে বাংলাদেশের এক গর্বিত নারী প্রতিনিধি। অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পিয়ার হিসেবে অধিষ্ঠিত প্রথম বাঙ্গালী নারী। যিনি প্রথম বাংলাদেশী মুসলমান নারী হিসেবে হাউস অব লর্ডসে প্রবেশ করেন। এমনকি তিনি নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ীই হাউস অব লর্ডসের সদস্য হিসেবে শপথ নেন। ১৯৯৮ সালে টনি ব্লেয়ারের উদ্যোগে ওই মর্যাদায় অভিষিক্ত হন তিনি।
মনজিলার জন্ম রাজশাহীর একটি গ্রামে। ১৯৭৩ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে পিতামাতার সঙ্গে বৃটেনে যান তিনি। বড় হয়েছেন লন্ডনের ইস্ট এন্ড-এ। ইস্ট হ্যাম-এর প্ল্যাশেট স্কুলে ও ইউনিভার্সিটি অব নর্থ লন্ডনে পড়েছেন। ডিপ্লোমা নিয়েছেন সমাজকর্মে। তার স্বামী কমর উদ্দিন। বাড়ি সুনামগঞ্জের ছাতকে। তাদের চার পুত্র এবং এক কন্যা। সপরিবারে তারা থাকেন টাওয়ার হ্যামলেটস বরা’র ওয়াপিং-এর এক বাসায়।
কাউন্সিলার মঈন কাদরীঃ-
বার্কিং ও দাগেনহামের কাউন্সিলার(গ্রীন পার্টি)
আনিশা ফারুক
যুক্তরাজ্যের বিশ্বখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের সভাপতি নির্বাচিত হন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ভোলার মেয়ে আনিশা ফারুক। চলতি বছরের জুলাইয়ে অক্সফোর্ডের ওয়েস্টন লাইব্রেরিতে ঘোষিত নির্বাচনী ফলাফলে আনিশাকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের সভাপতি ঘোষণা করা হয়।
ব্রিটেনে আনিশাই প্রথম কোন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিক্ষার্থী, যিনি ১৫২৯ ভোট পেয়ে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি ছাত্র সংসদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। আনিশার বাবা মেজর ফারুক আহামেদ একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা। তাদের গ্রামের বাড়ি ভোলার চর ফ্যাশন উপজেলায়।
এছাড়া আরও আছেন ড. মুহাম্মদ আব্দুল বারী। যিনি বৃটেনের সবচেয়ে বড় মুসলিম সংগঠন মুসলিম কাউন্সিল অব বৃটেনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মুরাদ কুরেইশি, যিনি লেবার পার্টির রাজনীতিবিদ হিসেবে গ্রেটার লন্ডন অ্যাসেম্বলিতে দায়িত্ব পালন করছেন।
এবার আসা যাক যুক্তরাষ্ট্র প্রাবসী বাংলাদেশী বংশোদভূতদের মধ্যে যারা খ্যাতিমান তাদের বিষয়ে। এদের মধ্যে আছেন- মার্কিন কংগ্রেসম্যান হ্যানসেন এইচ. ক্লার্ক, সালমান খান, আবু হেনা সাইফুল ইসলাম, সায়রা খান, জাবেদ করিম প্রমুখ।
নিউজটি শেয়ার করতে বাটনের উপর ক্লিক করুন